মার্কেটিং কি? সহজ সংজ্ঞা, উদাহরণ আর মূল ধারণা

মার্কেটিং মানে শুধু বিজ্ঞাপন বা বিক্রি না। সংজ্ঞা, একটা সহজ উদাহরণ, মার্কেটিং-এর জনকের পরিচয় আর কাজের কয়েকটা মূল ধারণা, এক লেখায়।

· হালনাগাদ · পড়তে ১৮ মিনিট · নাজমুল আহমেদ

মার্কেটিং, বাংলায় বিপণন বা বাজারজাতকরণ, হলো কাস্টমারের চাহিদা বোঝা, সেই চাহিদা মেটায় এমন পণ্য বা সেবা তৈরি করা, সঠিক দাম ঠিক করা, সেটা কাস্টমারের হাতের কাছে পৌঁছে দেওয়া আর তাকে জানানো কেন এটা তার কাজে লাগবে। এর লক্ষ্য লাভ রেখে কাস্টমার পাওয়া, তাকে সন্তুষ্ট রাখা আর ধরে রাখা। তাই মার্কেটিং শুধু বিজ্ঞাপন বা বিক্রি না, পণ্য বানানোর আগে থেকেই এর কাজ শুরু হয়।

এই লেখায়
  1. মার্কেটিং কাকে বলে?
  2. মার্কেটিং এর বাংলা অর্থ কি?
  3. ফিলিপ কটলার ও অন্যদের দেওয়া মার্কেটিং এর সংজ্ঞা
  4. একটা সহজ উদাহরণ
  5. মার্কেটিং এর কাজ কি?
  6. মার্কেটিং এর উদ্দেশ্য কী?
  7. মার্কেটিং এর বৈশিষ্ট্যগুলো কী কী?
  8. মার্কেটিং এর জনক কে?
  9. মার্কেটিং আর সেলস কি একই জিনিস?
  10. মার্কেটিং আর ব্র্যান্ডিং: পার্থক্য কোথায়
  11. মার্কেটিং মিক্স: মার্কেটিং-এর ৪P
  12. STP: কার কাছে বিক্রি করবেন, সেটা ঠিক করা
  13. মার্কেটিং ধারণার বিবর্তন
  14. মার্কেটিং কত প্রকার ও কি কি?
  15. মার্কেটিং শুরু হয় পণ্য বানানোর আগে
  16. কেন প্রতিটি ব্যবসার মার্কেটিং দরকার
  17. কিভাবে মার্কেটিং করতে হয়?
  18. মার্কেটিং-এর কাজে এআই কোথায় সাহায্য করে, কোথায় না
  19. মার্কেটিং শিখবেন কীভাবে
  20. মার্কেটিং নিয়ে প্রায়ই যে প্রশ্নগুলো আসে

“মার্কেটিং কি”, ইংরেজি হরফে যাকে অনেকে লেখেন “marketing ki”, প্রশ্নটা সহজ শোনালেও উত্তরে সবচেয়ে বেশি ভুল হয়। অনেকে মার্কেটিং বলতে বোঝেন বিজ্ঞাপন, নয়তো সেলস। কেউ ভাবেন ফেসবুক পেজে নিয়মিত পোস্ট দেওয়াই মার্কেটিং। এগুলো সবই মার্কেটিং-এর অংশ, কিন্তু কোনোটাই পুরো মার্কেটিং না।

১৬ বছরের বেশি সময় মার্কেটিং নিয়ে কাজ করছি। নতুনরা সবচেয়ে বেশি যেটা বাদ দিয়ে ফেলেন, সেটা এই ভিত: মার্কেটিং আসলে কী আর কীভাবে কাজ করে। আমি নিজেও শুরুতে ভিতটা ভালো করে না বুঝে কাজে নেমে পড়েছিলাম। তাতে সাফল্য আসে, কিন্তু দেরিতে, আর অনেক কাজ কেন করছেন বা কেন কাজ করছে না, তা বোঝা যায় না।

তাই এই লেখায় একে একে বলছি সংজ্ঞা আর বাংলা অর্থ, মার্কেটিং-এর কাজ, উদ্দেশ্য ও বৈশিষ্ট্য, জনক কে, সেলস আর ব্র্যান্ডিং থেকে পার্থক্য, প্রকারভেদ, কীভাবে শুরু করবেন, আর এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) কোথায় সাহায্য করে।

মার্কেটিং কাকে বলে?

মার্কেটিং বলতে বোঝায় কাস্টমারের কী দরকার তা খুঁজে বের করা আর লাভ রেখে সেটা মেটানোর পুরো প্রক্রিয়া। এর ভেতরে পড়ে কী বানাবেন, কত দামে বেচবেন, কীভাবে কাস্টমারের কাছে পৌঁছাবেন আর কীভাবে তাকে জানাবেন, এই সিদ্ধান্তগুলো। “লাভ রেখে” কথাটা জরুরি, কারণ ব্যবসা লোকসানে চললে কাস্টমারের চাহিদা বেশিদিন মেটানো যায় না।

সহজ বাংলায় মার্কেটিং হলো বাজারে ক্রেতা আর বিক্রেতার মধ্যে মূল্যের বিনিময় ঘটানোর পুরো প্রক্রিয়া। ক্রেতা টাকা দেয়, কারণ বদলে সে এমন কিছু পায় যা তার কাছে ওই টাকার চেয়ে বেশি মূল্যবান মনে হয়। বিক্রেতার কাজ হলো সেই মূল্য তৈরি করা, আর ক্রেতাকে সেটা বিশ্বাসযোগ্যভাবে বোঝানো।

আমার একটা ভিডিও ক্লাসে নতুনদের সংজ্ঞাটা এভাবে বলেছিলাম:

একজনের একটা প্রোডাক্ট আছে বা সার্ভিস আছে, উনি ওটা দিতে চায়, আরেকজনের ওই প্রোডাক্টটা লাগবে বা সার্ভিসটা লাগবে, এই দু'জনকে কানেক্ট যেভাবে করব, এটাকে বলে মার্কেটিং।
নাজমুল আহমেদ, ইউটিউব ভিডিও, আগস্ট ২০২৩

মার্কেটিং এর বাংলা অর্থ কি?

মার্কেটিং-এর বাংলা অর্থ বিপণন বা বাজারজাতকরণ। বাংলা উইকিপিডিয়ার “বিপণন” লেখাটা শুরুই হয়েছে এই দুটো শব্দ দিয়ে, পাশে বন্ধনীতে ইংরেজি marketing।

মার্কেটিং শব্দটার ভেতরেই আছে market, যার বাংলা বাজার, বিপণি বা কেনাবেচার স্থান। তাই মার্কেটিং-এর কথা উঠলেই বাজারের কথা আসে: কারা কিনবে, কারা বেচবে, আর দুই পক্ষ কীভাবে মিলবে। কথাবার্তায় আমরা মার্কেটিং শব্দটাই বলি, আর প্রমিত বাংলা লেখায় বিপণন শব্দটাও চলে। দুটোর মানে একই।

ফিলিপ কটলার ও অন্যদের দেওয়া মার্কেটিং এর সংজ্ঞা

বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আর লেখক মার্কেটিং-এর সংজ্ঞা একটু আলাদা করে দিয়েছেন। নিচে পাঁচটা সংজ্ঞা আছে, প্রতিটার ওপরে লেখা আছে সংজ্ঞাটা কার দেওয়া। বাংলা রূপটা আমার করা অনুবাদ।

আমেরিকান মার্কেটিং অ্যাসোসিয়েশন (AMA)

কাস্টমার আর সমাজের জন্য মূল্য তৈরি

কাস্টমার, ক্লায়েন্ট, অংশীদার আর পুরো সমাজের জন্য মূল্য আছে এমন কিছু তৈরি করা, জানানো, পৌঁছে দেওয়া আর বিনিময় করার কাজ, প্রতিষ্ঠান ও প্রক্রিয়ার সমষ্টিই মার্কেটিং।

চার্টার্ড ইনস্টিটিউট অব মার্কেটিং (CIM), যুক্তরাজ্য

লাভ রেখে চাহিদা মেটানো

মার্কেটিং হলো সেই ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়া, যার দায়িত্ব কাস্টমারের চাহিদা চিনে নেওয়া, আগে থেকে আঁচ করা আর লাভ রেখে সেটা মেটানো।

ফিলিপ কটলার, ১৯৮০

বিনিময়ের মাধ্যমে চাহিদা মেটানো

বিনিময় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মানুষের প্রয়োজন আর চাহিদা মেটানোই মার্কেটিং। ইংরেজি উইকিপিডিয়া এটাকে কটলারের ১৯৮০ সালের সংজ্ঞা হিসেবে উল্লেখ করেছে।

ফিলিপ কটলার, ২০১৮

সম্পর্ক গড়া আর মূল্য তৈরি

মার্কেটিং হলো সেই প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে কোম্পানি কাস্টমারকে যুক্ত করে, কাস্টমারের সাথে মজবুত সম্পর্ক গড়ে আর কাস্টমারের জন্য মূল্য তৈরি করে, যাতে বদলে কাস্টমারের কাছ থেকে মূল্য পেতে পারে।

ফিলিপ কটলার, নিজের ওয়েবসাইটে

কাস্টমারের জন্য সত্যিকারের মূল্য

মার্কেটিং হলো কাস্টমারের জন্য সত্যিকারের মূল্য তৈরির শিল্প, মানে কাস্টমারকে আগের চেয়ে ভালো অবস্থায় পৌঁছাতে সাহায্য করার শিল্প।

পরীক্ষায় “মার্কেটিং এর সংজ্ঞা দাও” প্রশ্ন এলে এই পাঁচটার যেকোনো একটা লিখতে পারেন, লেখকের বা প্রতিষ্ঠানের নামসহ। কিন্তু কাজের জীবনে যে সংজ্ঞাটা সবচেয়ে বেশি কাজে লাগে, সেটা হলো: কে কিনবে, কেন কিনবে, আর কেন আপনার কাছ থেকেই কিনবে, এই তিনটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা আর সেই অনুযায়ী ব্যবসাটা সাজানোই মার্কেটিং।

একটা সহজ উদাহরণ

ধরুন আপনি মতিঝিলের কোনো অফিসপাড়ায় দুপুরের খাবারের ব্যবসা শুরু করতে চান। মার্কেটিং-এর কাজ শুরু হয় রান্নার আগেই। আশেপাশের অফিসের মানুষ দুপুরে কী খায়, কত টাকার মধ্যে খেতে চায়, কখন খায়, আর এখন যেখানে খায় সেখানে তাদের কী অসুবিধা হয়, এগুলো জানাই মার্কেটিং।

হয়তো জানলেন, অনেকে ঘরের মতো খাবার চান, কিন্তু লাইনে দাঁড়ানোর সময় পান না। তখন সিদ্ধান্ত নিলেন ভাত, ডাল, একটা সবজি আর একটা মাছ বা মাংসের একটা সেট মেনু দেবেন, এটা আপনার পণ্য। অফিসের মানুষের সাধ্যের মধ্যে একটা দাম ঠিক করলেন, এটা দাম। আগের দিন অর্ডার নিয়ে দুপুর একটার মধ্যে অফিসে পৌঁছে দেবেন, এটা স্থান বা বিতরণ। আর আশেপাশের অফিসের ফেসবুক গ্রুপে পোস্ট দিলেন, রিসেপশনে মেনুসহ কার্ড রেখে এলেন, এটা প্রচার।

এখানে বিজ্ঞাপন, মানে কার্ড আর ফেসবুক পোস্ট, পুরো কাজের ছোট একটা অংশ। আসল মার্কেটিং হয়েছে আগেই, যখন আপনি বুঝেছেন কাস্টমার কী চায় আর সেই অনুযায়ী ব্যবসাটা সাজিয়েছেন। এই কারণেই বলা হয়, ভালো মার্কেটিং বিক্রিকে সহজ করে দেয়।

মার্কেটিং এর কাজ কি?

মার্কেটিং-এর কাজ মোটামুটি এই: কাস্টমার আর বাজারকে বোঝা, কার কাছে বিক্রি করবেন তা বেছে নেওয়া, পণ্য, দাম, পৌঁছানোর পথ আর প্রচার ঠিক করা, তারপর কাস্টমারকে ধরে রাখা। মতিঝিলের দুপুরের খাবারের ব্যবসাটা ধরে কাজগুলো পরপর সাজালে এমন দাঁড়ায়:

  • বাজার আর কাস্টমার নিয়ে গবেষণা: আশেপাশের অফিসের মানুষ কী খায়, কত টাকার মধ্যে, কখন। আমেরিকান মার্কেটিং অ্যাসোসিয়েশনের মতে, এই গবেষণার তথ্য দিয়ে সুযোগ আর সমস্যা চেনা ও বোঝা যায়।
  • কার কাছে বিক্রি করবেন, তা বেছে নেওয়া: কোন এলাকার কোন অফিস আগে। এটা নিয়ে STP-র অংশে আলাদা করে বলেছি।
  • পণ্য বা সেবা ঠিক করা: ভাত, ডাল, সবজি আর মাছ বা মাংসের একটা সেট মেনু।
  • দাম ঠিক করা: অফিসের মানুষের সাধ্যের মধ্যে, আবার আপনার লাভ রেখে।
  • কাস্টমারের হাতের কাছে পৌঁছে দেওয়া: আগের দিন অর্ডার নিয়ে দুপুর একটার মধ্যে অফিসে খাবার পৌঁছে দেওয়া।
  • জানানো আর আগ্রহী করা, মানে প্রচার: অফিসের ফেসবুক গ্রুপে পোস্ট, রিসেপশনে মেনুসহ কার্ড।
  • বিক্রির পরেও সম্পর্ক রাখা, যাতে কাস্টমার আবার কেনে: কটলারের ২০১৮ সালের সংজ্ঞাতেই আছে মজবুত সম্পর্ক গড়ার কথা।

পণ্য, দাম, পৌঁছানো আর প্রচারের কাজগুলোর ভিত্তি কটলারের একটা কথা: মার্কেটাররা পণ্যটাকে লক্ষ্য কাস্টমারের জন্য উপযুক্ত, আকর্ষণীয়, সাধ্যের মধ্যে আর সহজে পাওয়া যায় এমন করে চাহিদাকে প্রভাবিত করেন।

মার্কেটিং এর উদ্দেশ্য কী?

মার্কেটিং-এর উদ্দেশ্য কাস্টমার পাওয়া, তাকে সন্তুষ্ট রাখা আর ধরে রাখা, আর সেটা লাভ রেখে করা। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার প্রথম লাইনে মার্কেটিংকে বলা হয়েছে কাস্টমার পাওয়া, সন্তুষ্ট করা আর ধরে রাখার কাজ। চার্টার্ড ইনস্টিটিউট অব মার্কেটিং-এর সংজ্ঞায় আছে লাভজনকভাবে চাহিদা মেটানোর কথা।

ভিডিও ক্লাসে এই উদ্দেশ্যটা আমি এক কথায় বলেছিলাম: কাস্টমার অ্যাকুইজিশন, মানে কাস্টমার নিয়ে আসা। মার্কেটিং বলুন বা ডিজিটাল মার্কেটিং, আমরা যা-ই করি, প্রতিটা কাজের শেষ কথা এটাই। মার্কেটিং নিয়ে অনেকে কথা বলেন, কিন্তু কাস্টমার অ্যাকুইজিশন কথাটা কম মানুষই ব্যবহার করেন।

কাস্টমার আনার কাজটা মোটামুটি তিনটা জিনিসের ওপর দাঁড়িয়ে: মার্কেটিং, ব্র্যান্ডিং আর সেলস। তিনটা একসাথে চললে কাস্টমার আনার কাজটা সুন্দরভাবে হয়।

কটলারের কথাগুলোও একই দিকে যায়। তাঁর ভাষায় মার্কেটিং ম্যানেজমেন্ট হলো উন্নত মানের কাস্টমার-মূল্য তৈরি, পৌঁছে দেওয়া আর জানানোর মাধ্যমে লক্ষ্য বাজার বেছে নিয়ে কাস্টমার পাওয়া, ধরে রাখা আর বাড়ানোর শিল্প ও বিজ্ঞান। আরেকটা কথায় তিনি বলেছেন, মার্কেটিং-এর লক্ষ্য হলো বিক্রি করার প্রয়োজনটাই কমিয়ে আনা।

আমেরিকান মার্কেটিং অ্যাসোসিয়েশনের সংজ্ঞা আরও একটু বড় করে দেখে: মূল্য শুধু কাস্টমারের জন্য না, ক্লায়েন্ট, অংশীদার আর পুরো সমাজের জন্য। সমাজের এই কথাটা নিচে সামাজিক মার্কেটিং ধারণার সাথে মিলিয়ে পড়ে নিতে পারেন।

মার্কেটিং এর বৈশিষ্ট্যগুলো কী কী?

উপরের সংজ্ঞাগুলো পাশাপাশি রাখলে মার্কেটিং-এর সাতটা বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে। তালিকাটা আমি সংজ্ঞাগুলো থেকে সাজিয়েছি, এটা কোনো পাঠ্যবইয়ের নম্বর দেওয়া তালিকা না:

  1. ১কাস্টমার থেকে শুরু হয়, পণ্য থেকে না: চার্টার্ড ইনস্টিটিউট অব মার্কেটিং-এর সংজ্ঞায় আছে কাস্টমারের চাহিদা চিনে নেওয়া আর আগে থেকে আঁচ করার কথা। কটলারও বলেছেন, মার্কেটিং-এর লক্ষ্য কাস্টমারের প্রয়োজনটা বুঝে নেওয়া।
  2. ২মূল্যের বিনিময় ঘটায়: আমেরিকান মার্কেটিং অ্যাসোসিয়েশনের সংজ্ঞায় আছে মূল্য আছে এমন কিছু বিনিময় করার কথা, আর কটলারের ১৯৮০ সালের সংজ্ঞাতেও আছে বিনিময় প্রক্রিয়ার কথা।
  3. ৩যা বানিয়েছেন তা যেভাবে হোক গছিয়ে দেওয়ার কৌশল না: কটলারের ভাষায়, নিজের বানানো জিনিস ঝেড়ে ফেলার চালাক উপায় খোঁজার শিল্প মার্কেটিং না।
  4. ৪একটা কাজ না, অনেক কাজের প্রক্রিয়া: আমেরিকান মার্কেটিং অ্যাসোসিয়েশনের সংজ্ঞায় আছে কাজ, প্রতিষ্ঠান আর প্রক্রিয়ার কথা। তৈরি করা, জানানো, পৌঁছানো আর বিনিময়, সবই এর মধ্যে।
  5. ৫চলতেই থাকে, কারণ বাজার বদলায়: কটলারের দুটো কথা, মার্কেটিং এমন এক দৌড় যার কোনো শেষ দাগ নেই, আর বাজার সবসময় মার্কেটিং-এর চেয়ে দ্রুত বদলায়।
  6. ৬সম্পর্ক গড়ে আর কাস্টমার ধরে রাখে: কটলারের ২০১৮ সালের সংজ্ঞায় মজবুত সম্পর্ক গড়ার কথা আছে, আর ইংরেজি উইকিপিডিয়ার প্রথম লাইনে আছে কাস্টমার ধরে রাখার কথা।
  7. ৭লাভ আর সমাজ দুটোই দেখে: চার্টার্ড ইনস্টিটিউট অব মার্কেটিং-এর সংজ্ঞায় আছে লাভ রেখে চাহিদা মেটানোর কথা, আর আমেরিকান মার্কেটিং অ্যাসোসিয়েশনের সংজ্ঞায় আছে সমাজের জন্যও মূল্যের কথা।

পরীক্ষায় বৈশিষ্ট্য লিখতে বললে আপনার নিজের পাঠ্যবইয়ের তালিকাটাই লিখবেন। এই সাতটা দিয়ে আপনি প্রতিটা বৈশিষ্ট্য নিজের ভাষায় বুঝিয়ে লিখতে পারবেন।

মার্কেটিং এর জনক কে?

ফিলিপ কটলারকে (Philip Kotler) মার্কেটিং-এর জনক বলা হয়। তাঁর পরিচিত উপাধি “আধুনিক মার্কেটিং-এর জনক”, তাই “আধুনিক বিপণনের জনক কে” প্রশ্নের উত্তরও তিনিই।

কটলার একজন আমেরিকান মার্কেটিং লেখক, পরামর্শদাতা আর অধ্যাপক। তাঁর জন্ম ১৯৩১ সালের ২৭ মে, শিকাগোতে। ১৯৬২ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির কেলগ স্কুল অব ম্যানেজমেন্টে পড়িয়েছেন। তাঁর ডক্টরেট অর্থনীতিতে (এমআইটি, ১৯৫৬), তাই কোথাও কোথাও তাঁকে অর্থনীতিবিদ লেখা দেখবেন, তবে তাঁর পরিচয় মূলত মার্কেটিং-এর লেখক ও অধ্যাপক হিসেবে।

তাঁকে জনক বলার প্রধান কারণ, ইংরেজি উইকিপিডিয়ার ভাষায়, মার্কেটিং মিক্সকে জনপ্রিয় করে তোলা। ৪P কাঠামো ছড়াতে তিনি সাহায্য করেছেন বলেও উইকিপিডিয়া লিখেছে। তাঁর বই “Marketing Management”-এর প্রথম সংস্করণ বের হয় ১৯৬৭ সালে, আর এরপর বইটির অনেকগুলো নতুন সংস্করণ বেরিয়েছে।

৪P নিজে অবশ্য কটলারের দেওয়া না। ই. জেরোম ম্যাককার্থি ১৯৬০ সালে আজকের রূপের ৪P প্রথম প্রস্তাব করেন, তাই “৪P-এর জনক কে” প্রশ্নের উত্তর ম্যাককার্থি। পরীক্ষায় “মার্কেটিং এর জনক কে” এলে লিখুন ফিলিপ কটলার, আর ৪P-এর জনক কে এলে লিখুন ই. জেরোম ম্যাককার্থি।

মার্কেটিং আর সেলস কি একই জিনিস?

না, আর এই পার্থক্যটা বোঝা খুব জরুরি। সেলস বা বিক্রয়ের কাজ হলো যে পণ্য আছে তা বিক্রি করা, একজন নির্দিষ্ট ক্রেতাকে রাজি করানো। মার্কেটিং-এর কাজ তার আগের: কোন পণ্য বানানো উচিত, কার জন্য, কত দামে, আর কীভাবে এমন অবস্থা তৈরি করা যায় যাতে ক্রেতা নিজেই আগ্রহ নিয়ে আসে।

সেই ক্লাসেই ব্যাপারটা আমি এভাবে বলেছিলাম: মার্কেটিং-এর মূল দায়িত্ব সঠিক মানুষটাকে নিয়ে আসা, যার পণ্য বা সেবাটা লাগবে আর যে দাম দিতে পারবে। কারণ কারও টাকা থাকলেই হয় না, তাকে আপনার জন্য সঠিক মানুষও হতে হয়। সেই মানুষটাকে পুরোপুরি রাজি করিয়ে বিক্রিটা শেষ করা সেলসের কাজ। আমার ভাষায়, মার্কেটিং-এর কাজ মাছ ধরা, সেলসের কাজ মাছটা ভাজা।

ডিজিটালের কারণে মার্কেটিং আর সেলসের মাঝের এই দাগ অনেক জায়গায় ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। কিছু ইন্ডাস্ট্রিতে সেই দাগ আগেই মুছে গেছে, আর কিছু ইন্ডাস্ট্রিতে মুছে যাচ্ছে; মার্কেটিং কোথায় শেষ আর সেলস কোথায় শুরু, তা বলা কঠিন। তবু দুটোর লক্ষ্য যে আলাদা, তা কটলারের একটা কথায় পরিষ্কার: বিক্রির লক্ষ্য কাস্টমারের একটা প্রয়োজন মেটানো, আর মার্কেটিং-এর লক্ষ্য সেই প্রয়োজনটা কী, তা খুঁজে বের করা।

একইভাবে বিজ্ঞাপন আর মার্কেটিংও এক না। বিজ্ঞাপন প্রচারের একটা মাধ্যম, আর প্রচার নিজেই মার্কেটিং-এর চারটা মূল উপাদানের একটা মাত্র।

মার্কেটিং আর ব্র্যান্ডিং: পার্থক্য কোথায়

আমার কাছে মার্কেটিং হলো প্রস্তাব দেওয়া, আর ব্র্যান্ডিং হলো সেই কারণ, যার জন্য অন্যজন রাজি হন। অনেকে আমাকে এই দুইয়ের মূল পার্থক্য জিজ্ঞেস করেন, আর আমি বিয়ের প্রস্তাবের উদাহরণ দিই: “আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাই” বলাটা মার্কেটিং, আর ওই মানুষটা কেন রাজি হবেন, সেটা ব্র্যান্ডিং।

ব্র্যান্ড বলতে কী বোঝায়, আমেরিকান মার্কেটিং অ্যাসোসিয়েশন তা এভাবে বলে: একটা নাম, শব্দ, ডিজাইন, প্রতীক বা অন্য যেকোনো বৈশিষ্ট্য, যা এক বিক্রেতার পণ্য বা সেবাকে অন্য বিক্রেতাদের থেকে আলাদা করে চেনায়। আমার কাছে একেবারে ভেতরের কথাটা এই: ব্র্যান্ড হলো আপনি যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন আর রাখতে পারেন, সেটা। ব্র্যান্ডিং গড়ে ওঠে আপনি কী করেন তা পরিষ্কার করে মানুষকে জানিয়ে, তারপর কথামতো কাজটা করে দেখিয়ে।

একটা বাংলাদেশি উদাহরণ নিন: উপরের দুপুরের খাবারের ব্যবসাটা কথা দিয়েছিল, দুপুর একটার মধ্যে খাবার অফিসে পৌঁছে যাবে। ফেসবুক গ্রুপের পোস্ট আর রিসেপশনের কার্ড দিয়ে আরেকটা অফিসকে কাস্টমার করে আনা মার্কেটিং। কিন্তু প্রতিদিন কথামতো একটার মধ্যে খাবার পৌঁছাচ্ছে বলেই সেই অফিসের মানুষ না বলতেই আবার অর্ডার করেন, আর সেটাই ওই ব্যবসার ব্র্যান্ড। মার্কেটিং পরের অফিসকে নিয়ে আসে, আর রাখা কথাটা তাদের ধরে রাখে।

ভিডিও দেখুন

২০২৩ সালের এই ১৫ মিনিটের ভিডিওতে আমি মার্কেটিং কী, ব্র্যান্ডিং আর সেলস থেকে এটা কীভাবে আলাদা, আর বি-টু-বি ও বি-টু-সি মার্কেটিং-এর পার্থক্য ব্যাখ্যা করেছি।

মার্কেটিং-এর পরিচিতি: বাংলায় মার্কেটিং-এর বেসিক

মার্কেটিং মিক্স: মার্কেটিং-এর ৪P

মার্কেটিং-এর সিদ্ধান্তগুলো সাজানোর সবচেয়ে পরিচিত কাঠামো হলো ৪P, যাকে মার্কেটিং মিক্সও বলে। উপরের দুপুরের খাবারের উদাহরণে চারটাই ছিল:

  • পণ্য (Product): আপনি ঠিক কী দিচ্ছেন। শুধু জিনিসটা না, এর মান, ডিজাইন, প্যাকেজিং, ব্র্যান্ডের নাম আর বিক্রির পরের সেবাও এর মধ্যে পড়ে।
  • দাম (Price): কত টাকায় বিক্রি করবেন। দাম শুধু খরচের হিসাব না, কাস্টমার পণ্যটাকে কতটা মূল্যবান মনে করে আর প্রতিযোগীরা কত নিচ্ছে, সেটাও দেখতে হয়।
  • স্থান (Place): পণ্যটা কাস্টমারের কাছে কীভাবে পৌঁছাবে। দোকান, ডিস্ট্রিবিউটর, ওয়েবসাইট, ফেসবুক পেজ, হোম ডেলিভারি, সবই এর অংশ।
  • প্রচার (Promotion): কাস্টমারকে কীভাবে জানাবেন আর আগ্রহী করবেন। বিজ্ঞাপন, সোশ্যাল মিডিয়া, অফার, জনসংযোগ আর সেলস টিম, সবই এর মধ্যে।

সেবাভিত্তিক ব্যবসার জন্য পরে এর সাথে আরও তিনটা P যোগ হয়েছে: মানুষ (People), প্রক্রিয়া (Process) আর দৃশ্যমান প্রমাণ (Physical evidence), সব মিলিয়ে ৭P। ধরুন একটা কোচিং সেন্টার বা ক্লিনিক। সেখানে কারা সেবা দিচ্ছেন, সেবা পাওয়ার প্রক্রিয়া কতটা সহজ, আর জায়গাটা দেখে কাস্টমারের কতটা ভরসা হয়, এগুলোও বিক্রিকে সরাসরি প্রভাবিত করে। ৪P-এর আসল শিক্ষা হলো, সিদ্ধান্তগুলো একে অপরের সাথে মিলতে হবে। দামি প্রিমিয়াম পণ্য সস্তা অফারের বিজ্ঞাপন দিয়ে বিক্রি করা কঠিন, আবার খুব ভালো পণ্যও বিক্রি হয় না যদি কাস্টমার সেটা হাতের কাছে না পায়।

STP: কার কাছে বিক্রি করবেন, সেটা ঠিক করা

৪P ঠিক করার আগে একটা প্রশ্নের উত্তর লাগে: আপনার কাস্টমার আসলে কে। এর জন্য মার্কেটিং-এ তিন ধাপের একটা পদ্ধতি আছে, সংক্ষেপে STP:

  1. ১সেগমেন্টেশন (Segmentation): পুরো বাজারকে কয়েকটা দলে ভাগ করা, যেমন বয়স, এলাকা, আয়, প্রয়োজন বা আচরণ অনুযায়ী। সবার চাহিদা এক না, তাই সবাইকে একই কথা বললে কারো কাছেই ঠিকমতো পৌঁছায় না।
  2. ২টার্গেটিং (Targeting): সেই দলগুলোর মধ্যে এক বা একাধিক দল বেছে নেওয়া, যাদের চাহিদা আপনি সবচেয়ে ভালোভাবে মেটাতে পারেন আর যাদের কাছে বিক্রি করা লাভজনক।
  3. ৩পজিশনিং (Positioning): বেছে নেওয়া কাস্টমারের মনে আপনার ব্র্যান্ডের জন্য একটা পরিষ্কার জায়গা তৈরি করা। সবচেয়ে সাশ্রয়ী, সবচেয়ে দ্রুত ডেলিভারি, নাকি ঘরের মতো স্বাদ, কাস্টমার আপনাকে এক কথায় কীভাবে মনে রাখবে, সেটাই পজিশনিং।

নতুন উদ্যোক্তাদের একটা সাধারণ ভুল হলো “সবাই আমার কাস্টমার” ভাবা। যে পণ্য সবার জন্য, বাস্তবে সেটা কারো জন্যই বিশেষ কিছু না। ছোট একটা দল বেছে নিয়ে তাদের কাছে সবচেয়ে ভালো হয়ে ওঠা, তারপর ধীরে ধীরে বড় হওয়া, এটাই ব্যবসা টেকসইভাবে বাড়ানোর একটা ভালো পথ।

মার্কেটিং ধারণার বিবর্তন

সময়ের সাথে ব্যবসাগুলো মার্কেটিংকে কয়েকটা ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখেছে। ইংরেজি উইকিপিডিয়ায় সবচেয়ে বেশি উল্লেখ করা ধারণা পাঁচটা, আর বাংলা উইকিপিডিয়া এর সাথে ষষ্ঠ একটা ধারণা যোগ করেছে:

  • উৎপাদন ধারণা: বেশি উৎপাদন করো, খরচ কমাও, সস্তায় দাও, ক্রেতা এমনিই কিনবে।
  • পণ্য ধারণা: সবচেয়ে ভালো মানের পণ্য বানাও, ক্রেতা নিজেই খুঁজে নেবে।
  • বিক্রয় ধারণা: জোর দিয়ে প্রচার আর বিক্রির চেষ্টা না করলে মানুষ কিনবে না।
  • মার্কেটিং ধারণা: আগে ক্রেতার চাহিদা বোঝো, তারপর সেই অনুযায়ী পণ্য বানাও আর বিক্রি করো।
  • সামাজিক মার্কেটিং ধারণা: ক্রেতার চাহিদা মেটাও, কিন্তু এমনভাবে যাতে সমাজ আর পরিবেশেরও ক্ষতি না হয়।
  • সামগ্রিক মার্কেটিং ধারণা: মার্কেটিং-এর প্রতিটা কাজের একটা বড়, সমন্বিত আর নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য থাকা উচিত।

ইংরেজি উইকিপিডিয়া অনুযায়ী ১৮৬০-এর দশক থেকে ১৯৩০-এর দশক পর্যন্ত মার্কেটিং-এর চর্চায় উৎপাদন ধারণারই আধিপত্য ছিল। বাংলা উইকিপিডিয়া অনুযায়ী মার্কেটিং ধারণা এসেছে ১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি, সামাজিক ধারণা ১৯৭০-এর পরে, আর সামগ্রিক ধারণা একুশ শতকে। আজকের মার্কেটিং-এ সবচেয়ে প্রচলিত হলো মার্কেটিং ধারণা, যেটা কাস্টমারকে কেন্দ্রে রাখে। তবু কিছু ব্যবসা এখনো পণ্য বানিয়ে ফেলার পর ভাবে কীভাবে বিক্রি করবে। মার্কেটিং শেখার প্রথম বড় শিক্ষা হলো এই ক্রমটা উল্টে দেওয়া।

মার্কেটিং কত প্রকার ও কি কি?

চ্যানেলের দিক থেকে মার্কেটিং দুই রকম, প্রচলিত আর ডিজিটাল। ক্রেতার দিক থেকেও দুই রকম, বি-টু-বি আর বি-টু-সি, মানে অন্য ব্যবসার কাছে বিক্রি আর সরাসরি সাধারণ ক্রেতার কাছে বিক্রি। কোন দিক থেকে ভাগ করছেন তার ওপর প্রকারের সংখ্যা বদলায়, তাই একটা মোট সংখ্যা বলা যায় না। কাজের জীবনে এই নামগুলো সবচেয়ে বেশি শোনা যায়:

  • প্রচলিত বা ট্র্যাডিশনাল মার্কেটিং: টিভি, রেডিও, পত্রিকা, বিলবোর্ড, লিফলেট আর ইভেন্ট।
  • ডিজিটাল মার্কেটিং: সার্চ ইঞ্জিন, সোশ্যাল মিডিয়া, ইমেইল, ওয়েবসাইট আর মোবাইলের মাধ্যমে মার্কেটিং। বিস্তারিত লিখেছি ডিজিটাল মার্কেটিং কি লেখায়।
  • বি-টু-সি (B2C) মার্কেটিং: সাধারণ ক্রেতার কাছে বিক্রি, যেমন কাপড়, খাবার বা মোবাইল ফোন।
  • বি-টু-বি (B2B) মার্কেটিং: এক প্রতিষ্ঠান থেকে আরেক প্রতিষ্ঠানে বিক্রি, যেমন অফিসের সফটওয়্যার বা কারখানার কাঁচামাল। এখানে সিদ্ধান্ত নিতে সময় বেশি লাগে, আর একাধিক মানুষ মিলে সিদ্ধান্ত নেন।
  • সার্ভিস মার্কেটিং: হাতে ধরা যায় না এমন সেবা বিক্রি, যেমন ব্যাংকিং, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা বা পরামর্শ।
  • কনটেন্ট মার্কেটিং: কাজের তথ্য বা শিক্ষা দিয়ে মানুষের আস্থা অর্জন, তারপর সেই আস্থা থেকে বিক্রি।
  • মুখে মুখে প্রচার (ওয়ার্ড অব মাউথ): কাস্টমাররা নিজেদের মধ্যে কোনো পণ্য, সেবা বা কোম্পানি নিয়ে যে কথা বলেন। এটা কাজ করে, কারণ মানুষ ব্যক্তিগত সুপারিশে ভরসা করে। যেমন আপনার এলাকার ভালো একজন দর্জির খোঁজ আপনি পেলেন কোনো আত্মীয়ের মুখে।
  • কাস্টমারের মন বুঝে মার্কেটিং (সাইকোলজিক্যাল ও ইমোশনাল মার্কেটিং): ক্লাসে এই দুটো শব্দ আমি ব্যবহার করেছিলাম। সাইকোলজিক্যাল মার্কেটিং মানে কাস্টমারের মন কীভাবে কাজ করে তা আগে বুঝে তারপর মার্কেটিং করা। ধরুন আপনার কাস্টমাররা ব্র্যান্ডে ভরসা করেন আর একটু বেশি দিয়ে ভালো ব্র্যান্ডের জিনিস কিনতে চান। তখন প্রতিযোগী বিশ টাকায় বেচছে বলে আপনি দশ টাকায় দিতে চাইলে কাজ হবে না (দাম দুটো আমার উদাহরণের জন্য ধরা, বাজারের তথ্য না)। ইমোশনাল মার্কেটিং মানে অনুভূতিতে ছোঁয়া দেওয়া, যেমন কাস্টমারকে বোঝানো যে আপনার পণ্য নিলে তার কোনো বিরক্তি মিটে যাবে।

ক্লাসে আমি বলেছিলাম, বি-টু-বি মার্কেটিং-এ টাকার অঙ্ক প্রায়ই বড় হয় আর অনেক ক্রেতা সেলসের সাথে কথা বলতে চান, তাই এর মূল লক্ষ্য লিড আনা, মানে আগ্রহী সম্ভাব্য ক্রেতা জোগাড় করা। ইংরেজি উইকিপিডিয়া বলছে, বি-টু-বি-তে সবচেয়ে প্রচলিত প্রচার পদ্ধতি ব্যক্তিগত বিক্রয়, আর বি-টু-সি বেশি ব্যবহার করে সেলস প্রমোশন, জনসংযোগ, বিজ্ঞাপন ও সোশ্যাল মিডিয়া। ডিজিটাল পণ্যে বি-টু-সি-র পুরো যাত্রাটাই অনলাইনে হয়ে যেতে পারে। আমার উদাহরণ ছিল মোবাইল অ্যাপে চিকিৎসা সেবা দেওয়া একটা কোম্পানি: সোশ্যাল মিডিয়ার বিজ্ঞাপন, অ্যাপ ডাউনলোডের পেজ, বিকাশে পেমেন্ট, তারপর ডাক্তারের সাথে কথা। সেখানে মার্কেটিং কোথায় শেষ আর সেলস কোথায় শুরু, বলা যায় না।

কেন প্রতিটি ব্যবসার মার্কেটিং দরকার

ছোট ব্যবসার মালিকেরা প্রায়ই বলেন, আমার ব্যবসা ছোট, মার্কেটিং-এর দরকার নেই, পরিচিতরাই কেনে। সমস্যা হলো পরিচিত মানুষের সংখ্যা সীমিত, আর ব্যবসা বাড়াতে হলে অপরিচিত মানুষের কাছে পৌঁছাতেই হবে। তাছাড়া আপনার প্রতিযোগী যদি কাস্টমারকে আপনার চেয়ে ভালো বোঝে, তাহলে পরিচিতরাও একদিন সেদিকে চলে যেতে পারে।

মার্কেটিং মানেই বড় বাজেট না। নিজের কাস্টমারের সাথে নিয়মিত কথা বলা, কেন তারা কেনে আর কেন কেউ কেউ কেনে না তা লিখে রাখা, দাম আর অফার নিয়ে ছোট ছোট পরীক্ষা করা, এগুলো প্রায় বিনা খরচের মার্কেটিং। বড় কোম্পানিতে এই কাজগুলোই একটা পুরো টিম মিলে করে, পরিকল্পনা, বাজেট আর সাপ্তাহিক হিসাব ধরে।

কিভাবে মার্কেটিং করতে হয়?

ছোট একটা ব্যবসার জন্য কিভাবে মার্কেটিং করতে হয়, তার উত্তর এই ক্রমে: কাস্টমার কে তা ঠিক করুন, তার চাহিদা শুনুন, পণ্য আর দাম মেলান, তার কাছে পৌঁছান, কেন আপনি তা এক লাইনে বলুন, ফল মাপুন, আর কাস্টমারকে ধরে রাখুন। প্রতিটা ধাপের সাথে একটা যাচাইয়ের লাইন আছে, যা কাগজে মিলিয়ে দেখতে পারবেন:

৭টির মধ্যে ০টি হয়েছে

মার্কেটিং-এর কাজে এআই কোথায় সাহায্য করে, কোথায় না

এআই এখন মার্কেটিং-এর অনেক কাজের প্রথম খসড়া দ্রুত করে দিতে পারে, কিন্তু কাস্টমার কে আর তাকে কী দেবেন, সেই সিদ্ধান্ত আপনারই। এই সাইটের এআই মার্কেটিং টিম ম্যাপ পেজে (পেজটা ইংরেজিতে) একটা মডেল ডিজিটাল মার্কেটিং বিভাগের ৮টা ভূমিকা আর ৪৩টা নিয়মিত কাজ ভাগ করে দেখানো হয়েছে: ১৪টা কাজ সফটওয়্যার নিজেই চালায়, ২২টা কাজ এআই-এর সাহায্যে দ্রুত হয়, আর ৭টায় এখনো মানুষের বিচার বা সম্পর্ক লাগে। ম্যাপে এআই-এর সাহায্যের কাজ বলতে ধরা হয়েছে সেই কাজ, যা মানুষ করেন আর এআই খসড়া করে, পরামর্শ দেয় বা গতি বাড়ায়।

যা এআই-এর হাতে ছাড়বেন না

  • কাকে টার্গেট করবেনকার কাছে বিক্রি করবেন আর কাকে বাদ দেবেন, এই সিদ্ধান্ত। ম্যাপে এটা মানুষের বিচারের কাজ হিসেবে ধরা হয়েছে।
  • কাস্টমারের সাথে সম্পর্ককমেন্ট আর মেসেজের উত্তর দিয়ে কাস্টমারের সাথে সম্পর্ক গড়া। ম্যাপে এটাও মানুষের কাজ।
  • ব্র্যান্ডের কথা বলার ধরনব্র্যান্ড কীভাবে কথা বলবে, সেই নিয়ম ঠিক রাখা। ম্যাপে এটাও মানুষের কাজ।
  • প্রতিটা তথ্য মিলিয়ে দেখাপ্রকাশের আগে প্রতিটি তথ্য, দাম আর দাবি নিজে মিলিয়ে দেখা। এআই-এর লেখা লাইনের দায় আপনার।

যেখানে এআই সাহায্য করতে পারে

  • পরিকল্পনার খসড়াপরিকল্পনার একটা খসড়া আর বেছে নেওয়ার মতো কয়েকটা বিকল্প। বাছাইটা আপনার।
  • পোস্টের ক্যাপশনবাংলা আর ইংরেজি দুই ভাষাতেই ক্যাপশনের খসড়া।
  • লেখার প্রথম খসড়াব্লগের রূপরেখা আর প্রথম খসড়া। নিজের অভিজ্ঞতাটা যোগ করবেন আপনি।
  • পরীক্ষার জন্য কয়েকটা ভার্সনল্যান্ডিং পেজের একই কথার কয়েকটা ভার্সন, যেগুলো পরীক্ষা করে দেখা যায়।

এআই-এর দেওয়া খসড়ায় আপনার নিজের তথ্য, দাম আর কাস্টমার সম্পর্কে আপনার জানা কথাগুলো আপনাকেই যোগ করতে হবে, আর প্রতিটা লাইন প্রকাশের আগে নিজে পড়ে নিতে হবে। এআই নিয়ে একদম গোড়ার কথা পড়তে পারেন এআই কি লেখায়।

মার্কেটিং শিখবেন কীভাবে

মার্কেটিং শেখা শুরু করতে বিবিএ বা এমবিএ ডিগ্রি লাগে না। আমার পরামর্শ চারটা ধাপে:

  1. ১মূল ধারণাগুলো দিয়ে শুরু করুন: কাস্টমারের চাহিদা, ৪P, STP আর পজিশনিং। এই লেখার বিষয়গুলো পরিষ্কার হলে বাকিটা অনেক সহজ হয়ে যায়।
  2. ২চারপাশের ব্যবসাগুলোকে মার্কেটিং-এর চোখে দেখুন। কোনো বিজ্ঞাপন দেখলে ভাবুন, এটা কার জন্য, কী বলতে চাইছে, আর পণ্য ও দামের সাথে কথাটা মিলছে কি না।
  3. ৩ডিজিটাল দিকটা শিখুন। বাংলায় একদম বেসিক থেকে শেখার জন্য লিখেছি গোড়া থেকে ডিজিটাল মার্কেটিং বইটি, আর ভিডিওতে শিখতে চাইলে আছে বাংলা কোর্স ডিজিটাল মার্কেটিং ফান্ডামেন্টালস।
  4. ৪ছোট একটা বাস্তব কাজে হাত দিন। পরিচিত কারও ব্যবসার জন্য কাস্টমার কারা, তারা কী চায় আর তাদের কাছে কীভাবে পৌঁছানো যায়, এক পাতায় একটা পরিকল্পনা লিখে ফেলুন।

মার্কেটিং নিয়ে প্রায়ই যে প্রশ্নগুলো আসে

মার্কেটিং এর জনক কে?
ফিলিপ কটলারকে (Philip Kotler) আধুনিক মার্কেটিং-এর জনক বলা হয়, মূলত মার্কেটিং মিক্সকে জনপ্রিয় করার জন্য। তিনি একজন আমেরিকান মার্কেটিং লেখক ও অধ্যাপক, ১৯৬২ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির কেলগ স্কুল অব ম্যানেজমেন্টে পড়িয়েছেন, আর তাঁর বই “Marketing Management”-এর প্রথম সংস্করণ বের হয় ১৯৬৭ সালে।
মার্কেটিং কাকে বলে, এক কথায়?
লাভজনকভাবে কাস্টমারের চাহিদা মেটানোকে মার্কেটিং বলে। এর মধ্যে পড়ে চাহিদা বোঝা, সেই অনুযায়ী পণ্য বা সেবা তৈরি, দাম ঠিক করা, কাস্টমারের কাছে পৌঁছে দেওয়া আর তাকে জানানো কেন এটা তার কাজে লাগবে।
Marketing ki, ar eta sales theke alada kivabe?
মার্কেটিং হলো কাস্টমারের চাহিদা বুঝে কী বিক্রি হবে, কার কাছে, কত দামে আর কীভাবে, তা ঠিক করা ও জানানো। সেলস হলো নির্দিষ্ট একজন ক্রেতাকে রাজি করিয়ে বিক্রিটা সম্পন্ন করা। মার্কেটিং ক্রেতা তৈরি করে, সেলস সেই ক্রেতার সাথে লেনদেন শেষ করে।
মার্কেটিং-এর ৪P কী কী?
পণ্য (Product), দাম (Price), স্থান বা বিতরণ (Place) আর প্রচার (Promotion)। ১৯৬০ সালে ই. জেরোম ম্যাককার্থি এই কাঠামো দেন। সেবাভিত্তিক ব্যবসার জন্য এর সাথে মানুষ, প্রক্রিয়া আর দৃশ্যমান প্রমাণ যোগ করে একে ৭P বলা হয়।
মার্কেটিং শিখতে কি বিবিএ বা এমবিএ পড়তে হয়?
না। বিবিএ বা এমবিএ মার্কেটিং-এর তত্ত্ব ভালোভাবে শেখায়, কিন্তু অনেক মার্কেটার অন্য বিষয়ে পড়েও এই পেশায় এসেছেন। মূল ধারণাগুলো বই বা কোর্স থেকে শিখে বাস্তব প্রজেক্টে কাজে লাগালে মার্কেটিং-এ ক্যারিয়ার শুরু করা যায়।
ছোট ব্যবসার কি মার্কেটিং দরকার?
হ্যাঁ, বরং ছোট ব্যবসার জন্য মার্কেটিং আরও জরুরি, কারণ বাজেট কম বলে প্রতিটি টাকা সঠিক কাস্টমারের পেছনে খরচ হওয়া দরকার। শুরুটা হতে পারে প্রায় বিনা খরচে: কাস্টমারের সাথে কথা বলা, তারা কেন কেনে তা বোঝা, আর সেই কথাগুলো নিজের প্রচারে ব্যবহার করা।
মার্কেটিং এর মূলনীতি কয়টি?
মূলনীতি বলতে এখানে মার্কেটিং-এর মূল ধারণা বা দৃষ্টিভঙ্গিগুলো ধরা হয়েছে। এর কোনো একটা সংখ্যা সবাই মানেন না। ইংরেজি উইকিপিডিয়া লিখেছে, মার্কেটিং-এর চর্চা যে ধারণাগুলো থেকে আসে, তাদের ঠিক রূপ নিয়ে পণ্ডিতদের বিতর্ক এখনো চলছে। সবচেয়ে বেশি উল্লেখ করা পাঁচটা হলো উৎপাদন, পণ্য, বিক্রয়, মার্কেটিং আর সামাজিক মার্কেটিং ধারণা। বাংলা উইকিপিডিয়া এর সাথে সামগ্রিক মার্কেটিং ধারণা যোগ করে ছয়টা বলেছে। পরীক্ষায় আপনার নিজের পাঠ্যবইয়ে যে তালিকা আছে, সেটাই লিখুন। ধারণাগুলোর ব্যাখ্যা লেখার ভেতরে মার্কেটিং ধারণার বিবর্তনের অংশে আছে।