ডিজিটাল মার্কেটিং কি? কাজ, ধরন ও শেখার উপায়
সংজ্ঞা থেকে শুরু করে প্রধান চ্যানেল, একজন ডিজিটাল মার্কেটারের আসল কাজ আর শেখার একটা পরিষ্কার পথ, সব এক লেখায়।
· পড়তে ১১ মিনিট · নাজমুল আহমেদ
ডিজিটাল মার্কেটিং হলো ইন্টারনেট আর ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে পণ্য বা সেবার প্রচার ও বিক্রি করা। সার্চ ইঞ্জিন, ফেসবুক ও ইউটিউবের মতো সোশ্যাল মিডিয়া, ইমেইল, ওয়েবসাইট আর মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে সঠিক মানুষের কাছে সঠিক সময়ে সঠিক বার্তা পৌঁছানোই এর মূল কাজ। প্রচলিত মার্কেটিং-এর সাথে বড় পার্থক্য হলো, এখানে কতজন দেখল, কতজন ক্লিক করল আর কতজন কিনল, প্রায় সবকিছু মাপা যায়। তাই ছোট বাজেট নিয়েও শুরু করা যায়।
ডিজিটাল মার্কেটিং নিয়ে প্রশ্নটা আমি সবচেয়ে বেশি শুনি নতুনদের কাছ থেকে, আর প্রায় একই প্রশ্ন শুনি ব্যবসার মালিকদের কাছ থেকেও। কেউ গুগলে বাংলায় লেখেন “ডিজিটাল মার্কেটিং কি”, কেউ ইংরেজি হরফে লেখেন “digital marketing ki”। প্রশ্ন একটাই, কিন্তু উত্তরে যা পাওয়া যায় তার বেশিরভাগই হয় টুলের লম্বা তালিকা, নয়তো এমন সংজ্ঞা যা মুখস্থ করা যায় কিন্তু কাজে লাগানো যায় না।
গত ১৬ বছরের বেশি সময় ধরে আমি মার্কেটিং নিয়ে কাজ করছি। দেশি-বিদেশি কোম্পানির মার্কেটিং টিম গড়েছি, এখন কয়েকটি কোম্পানির পার্ট-টাইম CMO হিসেবে কাজ করি। এই লেখায় সেই অভিজ্ঞতা থেকে ডিজিটাল মার্কেটিং-এর পুরো ছবিটা সহজ ভাষায় সাজিয়েছি: এটা কী, কীভাবে কাজ করে, কত ধরনের আছে, একজন ডিজিটাল মার্কেটার আসলে সারাদিন কী করেন, আর আপনি কোথা থেকে শুরু করবেন।
ডিজিটাল মার্কেটিং কাকে বলে
সহজ করে বললে, মানুষ এখন যেখানে সময় কাটায়, সেখানেই তার কাছে পৌঁছানোর নাম ডিজিটাল মার্কেটিং। একসময় মানুষ খবরের কাগজ পড়ত, টিভি দেখত, রাস্তার বিলবোর্ডের দিকে তাকাত, তাই বিজ্ঞাপনও সেখানেই যেত। এখন দিনের বড় একটা অংশ কাটে মোবাইলের স্ক্রিনে: ফেসবুক স্ক্রল করে, ইউটিউবে ভিডিও দেখে, গুগলে কিছু খুঁজে। মার্কেটিংও তাই সেখানে চলে এসেছে।
তবে শুধু জায়গা বদলানোকে ডিজিটাল মার্কেটিং বলে না। মার্কেটিং-এর মূল কাজ একই থাকে: কে আপনার কাস্টমার, তার কী দরকার, আপনার পণ্য সেই দরকার কীভাবে মেটায়, আর এই কথাটা তাকে কীভাবে বিশ্বাসযোগ্যভাবে বলবেন। ডিজিটাল মাধ্যম এই কাজটা করার নতুন কিছু উপায় দিয়েছে, আর দিয়েছে প্রতিটি পদক্ষেপ মেপে দেখার সুযোগ। মার্কেটিং-এর এই মূল ভিত্তি নিয়ে আলাদা করে লিখেছি মার্কেটিং কি লেখায়। একদম নতুন হলে ওটা আগে পড়ে নিতে পারেন।
একটা উদাহরণ দিই। ধরুন মিরপুরে আপনার একটা ছোট কেকের দোকান আছে। পুরনো পদ্ধতিতে আপনি হয়তো এলাকায় লিফলেট বিলি করতেন, আর কতজন সেটা পড়ে দোকানে এলো তা জানার কোনো উপায় থাকত না। ডিজিটাল মার্কেটিং-এ আপনি ফেসবুকে শুধু আপনার এলাকার, নির্দিষ্ট বয়সের মানুষকে জন্মদিনের কেকের বিজ্ঞাপন দেখাতে পারেন। গুগল ম্যাপে দোকানের তথ্য দিয়ে রাখতে পারেন, যাতে কেউ কাছাকাছি কেকের দোকান খুঁজলে আপনাকে পায়। আর মাস শেষে দেখতে পারেন কোন বিজ্ঞাপন থেকে কতগুলো অর্ডার এসেছে।
ডিজিটাল মার্কেটিং কীভাবে কাজ করে
একজন অপরিচিত মানুষ কয়েকটা ধাপ পেরিয়ে আপনার কাস্টমার হয়ে ওঠে। ডিজিটাল মার্কেটিং-এর প্রতিটি কাজ এই ধাপগুলোর কোনো একটার জন্য:
- ১জানা: মানুষটা প্রথমবার জানল যে আপনার ব্র্যান্ড বা পণ্য আছে। হতে পারে একটা ভিডিও, একটা পোস্ট বা গুগলের সার্চ রেজাল্ট থেকে।
- ২আগ্রহ: সে আরেকটু জানতে চাইল। আপনার পেজ ঘুরে দেখল, ওয়েবসাইটে ঢুকল, রিভিউ পড়ল।
- ৩বিশ্বাস: অন্যদের সাথে তুলনা করে সে ভাবল আপনার কাছ থেকে কেনা নিরাপদ কি না। এখানে কাজ করে ভালো কনটেন্ট, সত্যিকারের রিভিউ আর মেসেজের দ্রুত উত্তর।
- ৪কেনা: সে অর্ডার করল, মেসেজ দিল বা ফর্ম পূরণ করল। কেনার পথটা যত সহজ, তত বেশি মানুষ এই ধাপ পার হয়।
- ৫আবার ফেরা: সন্তুষ্ট কাস্টমার আবার কেনে, বন্ধুকে বলে। ইমেইল, মেসেজ আর ভালো সার্ভিস দিয়ে এই সম্পর্কটা ধরে রাখতে হয়।
এই ধাপগুলোকে একসাথে মার্কেটিং ফানেল বলে, কারণ উপরে অনেক মানুষ থাকে আর প্রতিটি ধাপে কিছু মানুষ ঝরে যায়, ঠিক চোঙার মতো। ডিজিটাল মার্কেটিং-এর সুবিধা হলো, কোন ধাপে কতজন ঝরে যাচ্ছে তা দেখা যায়। ধরুন আপনার বিজ্ঞাপন অনেকে দেখছে, কিন্তু প্রায় কেউ ক্লিক করছে না, তাহলে সমস্যা বিজ্ঞাপনে। আবার অনেকে ওয়েবসাইটে আসছে কিন্তু কিনছে না, তাহলে সমস্যা হয়তো দামে, বিশ্বাসে বা কেনার প্রক্রিয়ায়। অনুমানের বদলে সংখ্যা দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়, এটাই ডিজিটাল মার্কেটিং-এর সবচেয়ে বড় শক্তি।
প্রচলিত মার্কেটিং আর ডিজিটাল মার্কেটিং-এর পার্থক্য
টিভি, রেডিও, পত্রিকা, বিলবোর্ড আর লিফলেটকে আমরা প্রচলিত বা ট্র্যাডিশনাল মার্কেটিং বলি। দুটোর মূল পার্থক্যগুলো এরকম:
- মাপা যায় কতটা: বিলবোর্ড কতজন দেখল তা আন্দাজ করতে হয়। ডিজিটাল বিজ্ঞাপনে কতজন দেখল, কতজন ক্লিক করল, কতজন কিনল, সেটা সংখ্যায় দেখা যায়।
- কাকে দেখাবেন: টিভির বিজ্ঞাপন সবাই দেখে, আপনার কাস্টমার হোক বা না হোক। ডিজিটালে এলাকা, বয়স আর আগ্রহ ধরে নির্দিষ্ট মানুষকে দেখানো যায়।
- খরচ: প্রচলিত মাধ্যমে শুরু করতেই বড় বাজেট লাগে। ডিজিটালে ছোট বাজেটে পরীক্ষা করে, যেটা কাজ করে সেখানে খরচ বাড়ানো যায়।
- কথোপকথন: পত্রিকার বিজ্ঞাপন একতরফা। ডিজিটালে কাস্টমার কমেন্ট করে, মেসেজ দেয়, রিভিউ লেখে, মানে দুই দিক থেকেই কথা হয়।
- গতি: ছাপা বিজ্ঞাপন একবার ছাপা হলে আর বদলানো যায় না। ডিজিটাল বিজ্ঞাপন কাজ না করলে আজই বদলানো যায়।
তার মানে এই না যে প্রচলিত মার্কেটিং শেষ হয়ে গেছে। অনেক ব্যবসায় এখনো টিভি, বিলবোর্ড বা দোকানের সাইনবোর্ড ভালো কাজ করে, আর বড় ব্র্যান্ডগুলো সাধারণত দুটোই একসাথে ব্যবহার করে। প্রশ্নটা কোনটা ভালো তা নয়। প্রশ্ন হলো আপনার কাস্টমার কোথায় আছে, আর আপনার বাজেটে কোনটা মাপা ও নিয়ন্ত্রণ করা সহজ।
ডিজিটাল মার্কেটিং-এর A to Z: প্রধান ধরনগুলো
ডিজিটাল মার্কেটিং একটা কাজ না, অনেকগুলো চ্যানেল আর দক্ষতার একটা পরিবার। নতুনদের জন্য প্রধান ধরনগুলো এক নজরে:
- সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন (SEO): গুগলে কেউ কিছু খুঁজলে আপনার ওয়েবসাইট যেন বিজ্ঞাপন ছাড়াই উপরের দিকে আসে, সেই কাজ। ফল আসতে সময় লাগে, কিন্তু একবার দাঁড়িয়ে গেলে অনেকদিন কাজ করে।
- সার্চ ইঞ্জিন মার্কেটিং (SEM) বা গুগল অ্যাডস: টাকা দিয়ে সার্চ রেজাল্টের উপরে বিজ্ঞাপন দেখানো। যে মানুষ ঠিক এই মুহূর্তে কিছু খুঁজছে, তার সামনে পৌঁছানোর দ্রুত উপায়।
- সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং (SMM): ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব, লিংকডইন বা টিকটকে পেজ চালানো, কনটেন্ট দেওয়া আর বিজ্ঞাপন চালানো। বাংলাদেশে বেশিরভাগ ব্যবসার ডিজিটাল মার্কেটিং এখান থেকেই শুরু হয়।
- কনটেন্ট মার্কেটিং: লেখা, ভিডিও, ছবি বা পডকাস্ট দিয়ে মানুষকে কাজের কিছু দেওয়া, যাতে তারা আপনাকে চেনে আর বিশ্বাস করে। আপনি এখন যে লেখাটা পড়ছেন, এটাও কনটেন্ট মার্কেটিং।
- ইমেইল মার্কেটিং: যারা আগ্রহ দেখিয়েছে বা কিনেছে, তাদের সাথে ইমেইলে যোগাযোগ রাখা। পুরনো কাস্টমারকে দিয়ে আবার কেনানোর সবচেয়ে কম খরচের উপায়গুলোর একটা।
- ভিডিও মার্কেটিং: ইউটিউব, রিলস বা শর্টস দিয়ে পণ্য দেখানো, কিছু শেখানো বা গল্প বলা। অনেক কিছু লিখে বোঝানো কঠিন, ভিডিওতে সহজ।
- ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিং: যাদের কথা মানুষ বিশ্বাস করে, তাদের মুখে পণ্যের কথা বলানো। সঠিক মানুষটা বাছাই করাই এখানে আসল কাজ, ফলোয়ারের সংখ্যা না।
- মোবাইল ও এসএমএস মার্কেটিং: মেসেজ, অ্যাপ নোটিফিকেশন আর মোবাইলের জন্য বানানো বিজ্ঞাপন। মানুষ যেহেতু বেশিরভাগ সময় মোবাইলেই থাকে, আপনার সবকিছু মোবাইলে ঠিকঠাক দেখায় কি না সেটা আগে দেখতে হয়।
- ওয়েব অ্যানালিটিক্স: গুগল অ্যানালিটিক্সের মতো টুল দিয়ে বোঝা, মানুষ কোথা থেকে আসছে, কী করছে আর কোথায় আটকে যাচ্ছে। বাকি সব কাজ ঠিক হচ্ছে কি না, সেটা এখান থেকেই বোঝা যায়।
- মার্কেটিং অটোমেশন: একই কাজ বারবার হাতে না করে সফটওয়্যার দিয়ে করানো, যেমন নতুন সাবস্ক্রাইবারকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটা স্বাগত ইমেইল পাঠানো।
সবগুলো একসাথে শিখতে হবে না, আর একজন মানুষের পক্ষে সবগুলোতে সমান দক্ষ হওয়াও বাস্তবসম্মত না। শুরুতে পুরো মানচিত্রটা চিনে রাখুন, তারপর একটা বা দুটো বেছে নিয়ে গভীরে যান। কোনটা বাছবেন, সেটা নিয়ে নিচে বলছি।
ডিজিটাল মার্কেটিং-এর কাজ কী
এই প্রশ্নের দুটো মানে হয়, আর দুটোই জানা দরকার। এক, একটা ব্যবসার জন্য ডিজিটাল মার্কেটিং কী কাজ করে। দুই, একজন ডিজিটাল মার্কেটার দিনে আসলে কী কাজ করেন।
ব্যবসার দিক থেকে ডিজিটাল মার্কেটিং-এর কাজ মোটামুটি পাঁচটা: নতুন মানুষের কাছে ব্র্যান্ডকে পরিচিত করা, আগ্রহী মানুষকে সম্ভাব্য ক্রেতা বা লিডে পরিণত করা, লিডকে বিক্রি পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া, পুরনো কাস্টমারকে ধরে রাখা, আর এই পুরো প্রক্রিয়া থেকে এমন তথ্য বের করা যা দিয়ে পরের সিদ্ধান্ত আরও ভালো হয়। কোন ব্যবসার জন্য কোনটা বেশি জরুরি, সেটা নির্ভর করে ব্যবসাটা কোন অবস্থায় আছে তার উপর। নতুন ব্র্যান্ডের আগে দরকার পরিচিতি। আর যার ক্রেতা অনেক কিন্তু কেউ দ্বিতীয়বার কেনে না, তার সমস্যা অন্য জায়গায়।
আর একজন ডিজিটাল মার্কেটারের সাধারণ কাজের দিনে থাকে: কাস্টমার কারা আর তারা কী খুঁজছে তা নিয়ে রিসার্চ, কোন চ্যানেলে কী করা হবে তার পরিকল্পনা, কনটেন্ট তৈরি করা বা করানো, বিজ্ঞাপন চালানো ও নিয়মিত ঠিক করা, সংখ্যা দেখে রিপোর্ট বানানো, আর ছোট ছোট পরীক্ষা, যেমন দুটো আলাদা হেডলাইনের মধ্যে কোনটা বেশি কাজ করে। বাইরে থেকে কাজটাকে পোস্ট দেওয়া আর বুস্ট করা মনে হয়, কিন্তু ভালো মার্কেটারের সময়ের বড় অংশ যায় ভাবা, মাপা আর শেখায়।
বাংলাদেশে ডিজিটাল মার্কেটিং কেন এত জরুরি
বাংলাদেশে ব্যবসা করার ধরন গত কয়েক বছরে অনেক বদলে গেছে। অসংখ্য ছোট উদ্যোক্তা শুধু একটা ফেসবুক পেজ দিয়েই ব্যবসা চালাচ্ছেন, যাকে আমরা এফ-কমার্স বলি। কাপড়, খাবার, হস্তশিল্প থেকে শুরু করে প্রশিক্ষণ পর্যন্ত, অনেক কিছুই এখন মেসেজে অর্ডার আর মোবাইল পেমেন্টে বিক্রি হয়। দোকান ভাড়া না নিয়েও ব্যবসা শুরু করা যায়, এটা বড় সুযোগ।
আবার একই কারণে প্রতিযোগিতাও বেড়েছে। একই পণ্য অনেক পেজ বিক্রি করছে, আর কাস্টমারের সামনে বিকল্পের অভাব নেই। এই অবস্থায় এগিয়ে থাকে সেই ব্যবসা, যে নিজের কাস্টমারকে ভালো বোঝে, স্পষ্ট করে বলতে পারে কেন তার কাছ থেকেই কিনতে হবে, আর সংখ্যা দেখে খরচ নিয়ন্ত্রণ করে। মাঝারি আর বড় কোম্পানির ক্ষেত্রেও একই কথা। কাস্টমার অনলাইনে তুলনা করে তারপর সিদ্ধান্ত নেয়, তাই অনলাইনে ব্র্যান্ডের উপস্থিতি এখন আর ঐচ্ছিক না।
চাকরির বাজারেও এর প্রভাব স্পষ্ট। অনেক কোম্পানি এখন এমন মানুষ খোঁজে যারা ডিজিটাল চ্যানেল বোঝে। শুধু মার্কেটিং বিভাগে না, সেলস, কনটেন্ট তৈরি বা নিজের ব্যবসা চালানোতেও ডিজিটাল মার্কেটিং-এর বেসিক জানা এখন বাড়তি যোগ্যতা।
ডিজিটাল মার্কেটিং-এ ক্যারিয়ার: কী ধরনের কাজ আছে
ডিজিটাল মার্কেটিং শিখে সাধারণত এই ধরনের পদে কাজ করা যায়। নামগুলো কোম্পানিভেদে একটু আলাদা হয়, কাজ মোটামুটি একই:
- সোশ্যাল মিডিয়া এক্সিকিউটিভ বা ম্যানেজার: পেজ চালানো, কনটেন্টের পরিকল্পনা, কমেন্ট আর মেসেজের উত্তর, বিজ্ঞাপন।
- কনটেন্ট রাইটার বা কনটেন্ট মার্কেটার: ব্লগ, ক্যাপশন, ভিডিওর স্ক্রিপ্ট আর ওয়েবসাইটের লেখা।
- পারফরম্যান্স মার্কেটার: ফেসবুক ও গুগলে টাকা দিয়ে বিজ্ঞাপন চালিয়ে বিক্রি বা লিড আনা, আর প্রতিটি টাকার হিসাব রাখা।
- এসইও এক্সিকিউটিভ: ওয়েবসাইটকে সার্চ রেজাল্টে উপরে আনার কাজ।
- ইমেইল ও সিআরএম মার্কেটার: কাস্টমারের তথ্য আর ইমেইল দিয়ে পুরনো কাস্টমারকে ধরে রাখা।
- ডিজিটাল মার্কেটিং ম্যানেজার: পুরো টিম আর বাজেটের দায়িত্ব, কোন চ্যানেলে কত খরচ হবে সেই সিদ্ধান্ত।
এর বাইরে কেউ এজেন্সিতে একসাথে কয়েকটা ব্র্যান্ডের কাজ করেন, কেউ দেশের বাইরের কোম্পানির জন্য রিমোটে কাজ করেন, কেউ নিজের ব্যবসাতেই এই দক্ষতা কাজে লাগান। যে পথেই যান, একটা কথা আমি সবসময় বলি: টি-শেপড মার্কেটার হওয়ার চেষ্টা করুন। মানে সব চ্যানেল সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা থাকবে, আর একটা বা দুটো বিষয়ে থাকবে গভীর দক্ষতা। শুধু একটা টুল জানা মানুষ টুল বদলালে বিপদে পড়েন, আর সবকিছু একটু একটু জানা মানুষকে কেউ নির্দিষ্ট দায়িত্ব দিতে ভরসা পায় না।
ডিজিটাল মার্কেটিং শেখার উপায়: কোথা থেকে শুরু করবেন
নতুনদের জন্য আমার পরামর্শ পাঁচটা ধাপে:
- ১মার্কেটিং-এর বেসিক দিয়ে শুরু করুন, টুল দিয়ে না। কাস্টমার, চাহিদা, পজিশনিং, এই শব্দগুলো পরিষ্কার না হলে ফেসবুকের অ্যাডস ম্যানেজার শিখেও লাভ কম। শুরুর জন্য পড়তে পারেন মার্কেটিং কি।
- ২পুরো মানচিত্রটা একবার দেখে নিন। উপরের প্রতিটি চ্যানেল কী করে, সেটা মোটামুটি বুঝুন। আমার বাংলা কোর্স ডিজিটাল মার্কেটিং ফান্ডামেন্টালস এই কাজের জন্যই বানানো: এসইও, অ্যানালিটিক্স, সোশ্যাল মিডিয়া, ইমেইল আর পেইড অ্যাডস এক জায়গায়, আর ভিডিওগুলো ফ্রিতে দেখা যায়। যারা পড়ে শিখতে পছন্দ করেন, তাদের জন্য একই বেসিক বই আকারে আছে গোড়া থেকে ডিজিটাল মার্কেটিং নামে।
- ৩একটা চ্যানেল বেছে নিয়ে গভীরে যান। যে কাজটা করতে আপনার ভালো লাগে, সেখান থেকে শুরু করুন। লিখতে ভালো লাগলে কনটেন্ট, সংখ্যা নিয়ে কাজ করতে ভালো লাগলে পারফরম্যান্স মার্কেটিং বা অ্যানালিটিক্স।
- ৪ছোট একটা সত্যিকারের প্রজেক্টে হাত দিন। পরিচিত কারও ব্যবসা, নিজের একটা পেজ বা ছোট একটা ওয়েবসাইট। অল্প বাজেটে নিজে বিজ্ঞাপন চালিয়ে দেখা দশটা ভিডিও দেখার চেয়ে বেশি শেখায়।
- ৫যা করলেন তা লিখে রাখুন: কী করেছিলেন, সংখ্যা কী বলল, পরের বার কী বদলাবেন। এই নোটগুলোই পরে আপনার পোর্টফোলিও, আর চাকরির ইন্টারভিউতে সবচেয়ে কাজের জিনিস।
কতদিন লাগবে, এই প্রশ্নের সৎ উত্তর হলো, বেসিক বুঝতে কয়েক সপ্তাহই যথেষ্ট, কিন্তু নিজে দায়িত্ব নিয়ে কাজ করার মতো আত্মবিশ্বাস আসে নিয়মিত হাতে-কলমে কাজ করার কয়েক মাস পর। আর ডিজিটাল মার্কেটিং-এ শেখা কখনো শেষ হয় না, কারণ প্ল্যাটফর্মগুলো প্রতিনিয়ত বদলায়। তবে মার্কেটিং-এর মূল নিয়মগুলো বদলায় না, তাই বেসিক শক্ত হলে নতুন টুল শেখা সহজ হয়ে যায়।
ব্যবসার মালিক হলে কোথা থেকে শুরু করবেন
আপনি যদি নিজে মার্কেটার হতে না চান, বরং নিজের ব্যবসার জন্য ডিজিটাল মার্কেটিং বুঝতে চান, তাহলে শুরুটা একটু আলাদা। প্রথমে ঠিক করুন আগামী তিন মাসে মার্কেটিং থেকে আপনি ঠিক কী চান: নতুন কাস্টমার, পুরনো কাস্টমারের কাছ থেকে বেশি বিক্রি, নাকি ব্র্যান্ডের পরিচিতি। তারপর দেখুন আপনার কাস্টমার কোন একটা বা দুটো চ্যানেলে সবচেয়ে বেশি থাকে, আর শুধু সেখানে ভালো করে কাজ করুন। সব প্ল্যাটফর্মে একটু একটু থাকার চেয়ে এক জায়গায় নিয়মিত থাকা অনেক বেশি কাজ দেয়।
আর প্রতি সপ্তাহে অল্প কয়েকটা সংখ্যা দেখার অভ্যাস করুন: কত টাকা খরচ হলো, কতজন আগ্রহ দেখাল, কতজন কিনল। এই অভ্যাসটাই মার্কেটিংকে খরচ থেকে বিনিয়োগে বদলে দেয়। নিজের টিম নিয়ে পরিকল্পনা সাজাতে অভিজ্ঞ কারও সাহায্য চাইলে আমার ডিজিটাল মার্কেটিং এক্সপার্ট ও কনসালট্যান্ট পেজে কাজের ধরনটা দেখে নিতে পারেন।
ডিজিটাল মার্কেটিং নিয়ে প্রায়ই যে প্রশ্নগুলো আসে
- ডিজিটাল মার্কেটিং কাকে বলে, এক কথায়?
- ইন্টারনেট আর ডিজিটাল মাধ্যম, যেমন সার্চ ইঞ্জিন, সোশ্যাল মিডিয়া, ইমেইল, ওয়েবসাইট আর মোবাইল ব্যবহার করে পণ্য বা সেবার প্রচার ও বিক্রির পুরো প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল মার্কেটিং বলে। এর বিশেষ দিক হলো, প্রায় প্রতিটি ফলাফল মেপে দেখা যায়।
- Digital marketing ki, ar eta ki Banglay shekha jay?
- হ্যাঁ। ডিজিটাল মার্কেটিং মানে ইন্টারনেট ব্যবহার করে পণ্য বা সেবার মার্কেটিং, আর এর বেসিক পুরোটাই বাংলায় শেখা যায়। টুলগুলোর মেনু ইংরেজিতে থাকে, কিন্তু ধারণাগুলো বাংলায় বুঝে নিলে ইংরেজি মেনু চালানো কঠিন কিছু না। শুরুর জন্য আমার বাংলা কোর্স ডিজিটাল মার্কেটিং ফান্ডামেন্টালস দেখতে পারেন, এর ভিডিওগুলো ফ্রিতে দেখা যায়।
- ডিজিটাল মার্কেটিং শিখতে কতদিন লাগে?
- বেসিক ধারণা পেতে কয়েক সপ্তাহ যথেষ্ট। তবে নিজে একটা চ্যানেলের দায়িত্ব নিয়ে কাজ করার মতো দক্ষতা আসে কয়েক মাস নিয়মিত হাতে-কলমে কাজের পর। সময়টা কম-বেশি হয় আপনি সপ্তাহে কত ঘণ্টা দিচ্ছেন আর সত্যিকারের প্রজেক্টে কাজ করছেন কি না তার উপর।
- ডিজিটাল মার্কেটিং শিখতে কি বড় বাজেট বা দামি ল্যাপটপ লাগে?
- না। শেখার জন্য একটা সাধারণ ল্যাপটপ বা কম্পিউটার আর ইন্টারনেট সংযোগ হলেই চলে। বিজ্ঞাপন চালানো শিখতে চাইলে নিজের পরীক্ষার জন্য অল্প কিছু টাকা রাখা ভালো, কারণ নিজের টাকায় চালানো ছোট একটা বিজ্ঞাপন যতটা শেখায়, শুধু দেখে বা পড়ে ততটা শেখা যায় না।
- ফেসবুকে পোস্ট বুস্ট করাই কি ডিজিটাল মার্কেটিং?
- বুস্ট করা ডিজিটাল মার্কেটিং-এর ছোট একটা অংশ, পুরোটা না। কাকে দেখাবেন, কী বলবেন, ক্লিক করার পর মানুষটা কী দেখবে আর শেষে কতজন কিনল, এই পুরো পরিকল্পনা আর মাপজোখ মিলেই ডিজিটাল মার্কেটিং। পরিকল্পনা ছাড়া বুস্ট করলে সাধারণত টাকা খরচ হয়, ফল আসে কম।
- ডিজিটাল মার্কেটিং আর অনলাইন মার্কেটিং কি একই জিনিস?
- প্রায় একই অর্থে ব্যবহার হয়। অনলাইন মার্কেটিং বলতে শুধু ইন্টারনেটের কাজ বোঝায়। ডিজিটাল মার্কেটিং শব্দটা একটু বড়, এর মধ্যে এসএমএসের মতো ইন্টারনেট ছাড়া ডিজিটাল মাধ্যমও পড়ে। বাস্তবে চাকরির বিজ্ঞাপন বা কোর্সে দুটো শব্দ একই কাজ বোঝাতেই ব্যবহার হয়।
- ডিজিটাল মার্কেটিং শিখে কী ধরনের চাকরি পাওয়া যায়?
- সোশ্যাল মিডিয়া এক্সিকিউটিভ, কনটেন্ট রাইটার, পারফরম্যান্স মার্কেটার, এসইও এক্সিকিউটিভ আর ইমেইল মার্কেটার থেকে শুরু করে, অভিজ্ঞতা বাড়লে ডিজিটাল মার্কেটিং ম্যানেজার পর্যন্ত। এজেন্সি, দেশি কোম্পানি, দেশের বাইরের কোম্পানির রিমোট কাজ বা নিজের ব্যবসা, সব জায়গাতেই এই দক্ষতা কাজে লাগে।