অনলাইন বিজনেস কিভাবে করব? এফ-কমার্স কি ও বাস্তব আইডিয়া
এফ-কমার্স আসলে কী, অল্প পুঁজিতে ধাপে ধাপে কীভাবে শুরু করবেন, পেজের নাম, দাম, ডেলিভারি, পেমেন্ট আর সরকারি নিয়ম, সাথে ১৫টি আইডিয়া আর প্রতিটার কঠিন দিক, সব এক লেখায়।
· পড়তে ১৬ মিনিট · নাজমুল আহমেদ
এফ-কমার্স মানে ফেসবুক কমার্স: ফেসবুক পেজ, গ্রুপ বা মেসেঞ্জারের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি, যেখানে অর্ডার আসে মেসেজে আর টাকা সাধারণত আসে ক্যাশ অন ডেলিভারিতে। বাংলাদেশে অনলাইন বিজনেস শুরুর সবচেয়ে সহজ পথ এটাই। শুরু করতে লাগে এমন একটা পণ্য যা আপনি নিয়মিত জোগান দিতে পারবেন, অল্প করে চাহিদা যাচাই, ডেলিভারি খরচ ধরে দাম, একটা কুরিয়ার, বাংলায় লেখা রিটার্ন পলিসি, আর সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী অন্তত একটি নিবন্ধন।
ধরুন ঢাকার এক তরুণী পছন্দের কয়েকটা থ্রি-পিস কিনে এনে ফেসবুকে ছবি দিলেন, কয়েকজন বন্ধু অর্ডার করলেন, আর সেখান থেকেই একটা ছোট পেজ দাঁড়িয়ে গেল। কিংবা সিলেটের একজন হোম বেকার আগে প্রতিবেশীদের জন্য জন্মদিনের কেক বানাতেন, এখন মেসেঞ্জারে অর্ডার নেন। বাংলাদেশে অনলাইন বিজনেস বলতে বেশিরভাগ মানুষ এমন কিছুই বোঝেন: বড় কোনো ওয়েবসাইট নয়, একটা ফেসবুক পেজ, একটা ফোন আর একটা কুরিয়ার।
তাই গুগলে প্রশ্নগুলোও আসে এভাবে: “অনলাইন বিজনেস কিভাবে করব”, “অনলাইন বিজনেস আইডিয়া”, আর কেউ ইংরেজি হরফে লেখেন “f commerce” বা “f commerce meaning”। এই লেখা তাদের জন্য, যারা বাংলাদেশে ছোট পরিসরে, সীমিত পুঁজি নিয়ে, সম্ভবত একটা ফেসবুক পেজ দিয়ে ব্যবসা শুরু করতে চান।
লেখায় পাবেন পাঁচটা জিনিস। এফ-কমার্স আসলে কী, আর ই-কমার্স থেকে এর পার্থক্য কোথায়। শুরু করার ধাপগুলো, পণ্য বাছাই থেকে কুরিয়ার পর্যন্ত। সরকারের ডিজিটাল কমার্স নির্দেশিকায় বিক্রেতার জন্য কী বলা আছে। ১৫টি আইডিয়া, প্রতিটার সাথে কী লাগে আর কোথায় কঠিন তার খোলামেলা হিসাব। আর নতুনরা সাধারণত কোন ভুলগুলো করেন।
আমি নাজমুল আহমেদ। ১৬ বছরের বেশি সময় ধরে মার্কেটিং নিয়ে কাজ করছি, মার্কেটিং টিম গড়েছি ও নেতৃত্ব দিয়েছি। এই লেখায় আয়ের কোনো প্রতিশ্রুতি নেই, কারণ সৎভাবে সেটা কেউ দিতে পারে না। আছে একটা ছোট ব্যবসা ঠিকভাবে দাঁড় করানোর বাস্তব পথ।
এফ-কমার্স কী, আর ই-কমার্স থেকে এর পার্থক্য
এফ-কমার্স শব্দটা এসেছে ফেসবুক কমার্স থেকে। মানে ফেসবুক পেজ, ফেসবুক গ্রুপ আর মেসেঞ্জারের মাধ্যমে পণ্য বা সেবা বিক্রি করা। বাস্তবে এর সাথে হোয়াটসঅ্যাপ আর ইনস্টাগ্রামও যুক্ত হয়ে যায়। ক্রেতা পোস্ট দেখে মেসেজ দেন, দাম জিজ্ঞেস করেন, ঠিকানা আর ফোন নম্বর দেন, আর অর্ডারটা কনফার্ম হয় ইনবক্সেই। কোনো ওয়েবসাইটের কার্ট বা চেকআউট পেজ লাগে না।
একটা কথা জেনে রাখা ভালো: “এফ-কমার্স” শব্দটা বাংলাদেশে যতটা চলে, অন্য দেশে ততটা নয়; সেখানে একই জিনিসকে সাধারণত সোশ্যাল কমার্স (social commerce) বলা হয়, মানে সোশ্যাল মিডিয়ার ভেতরেই কেনাবেচা। তাই বিদেশি কোনো লেখা বা ভিডিওতে সোশ্যাল কমার্স দেখলে বুঝবেন, একই জিনিসের কথা বলা হচ্ছে।
ই-কমার্স হলো অনলাইনে কেনাবেচার বড় পরিসর: নিজের ওয়েবসাইট বা কোনো মার্কেটপ্লেসে দোকান, যেখানে ক্রেতা নিজেই পণ্য কার্টে তোলেন, অর্ডার দেন, অনেক সময় অনলাইনেই দাম পরিশোধ করেন। এফ-কমার্স এই বড় ছাতার নিচেই পড়ে, শুধু দোকানটা ফেসবুকে। পাশাপাশি রাখলে পার্থক্য দেখা যায় চারটা জায়গায়।
প্রথমত, শুরুর খরচ। ফেসবুক পেজ খুলতে টাকা লাগে না। ওয়েবসাইটে ডোমেইন, হোস্টিং আর তৈরির খরচ আছে, আর অনেক মার্কেটপ্লেস বিক্রির উপর কমিশন নেয়। দ্বিতীয়ত, ক্রেতার সাথে সম্পর্ক কার হাতে। পেজটা আপনার, কিন্তু জায়গাটা ফেসবুকের। নিয়ম ভাঙার অভিযোগে, এমনকি ভুল করেও পেজ রেস্ট্রিক্টেড বা বন্ধ হয়ে যেতে পারে, আর তখন দোকানটাই বন্ধ। নিজের ওয়েবসাইট আর ক্রেতাদের নিজের তালিকা থাকলে সেই ঝুঁকি কম।
তৃতীয়ত, অর্ডার আর পেমেন্ট। এফ-কমার্সে অর্ডার আসে মেসেজে, টাকা বেশিরভাগ সময় ক্যাশ অন ডেলিভারিতে। ই-কমার্স সাইটে চেকআউট আর অনলাইন পেমেন্ট থাকে। চতুর্থত, বড় হওয়ার সুযোগ। দিনে কয়েকটা অর্ডার মেসেজে সামলানো যায়। কিন্তু অর্ডার অনেক বাড়লে প্রতিটা মেসেজ থেকে হাতে হাতে ঠিকানা টুকে নিতে গিয়ে ভুল বাড়ে, তখন ওয়েবসাইট বা একটা অর্ডার সিস্টেম কাজে আসে।
তাহলে কোনটা ভালো? শুরুর জন্য এফ-কমার্স সস্তা আর দ্রুত, যেখানে কম খরচে যাচাই করা যায় আপনার পণ্য মানুষ আসলেই চায় কি না। অর্ডার নিয়মিত হলে আর মেসেজে সামলানো কঠিন হয়ে গেলে তখন ওয়েবসাইটের কথা ভাবুন। উল্টো পথে গেলে, মানে আগে বড় ওয়েবসাইট বানিয়ে পরে ক্রেতা খুঁজলে, টাকা আর সময় দুটোই আটকে যায়।
অনলাইন বিজনেস কীভাবে শুরু করবেন: ধাপে ধাপে
নিচের ক্রমটা মানলে নতুনদের সবচেয়ে সাধারণ ভুলগুলো শুরুতেই এড়ানো যায়। প্রতিটা ধাপ ছোট, কিন্তু কোনোটা বাদ দেবেন না।
- ১এমন পণ্য বাছুন যা আপনি নিয়মিত জোগান দিতে পারবেন, যেটা সবচেয়ে জনপ্রিয় শোনায় সেটা নয়। নিজেকে তিনটা প্রশ্ন করুন: কে কিনবে, আমি কোথা থেকে আনব, আর আগামী মাসে আবার একই মানের জিনিস আনতে পারব কি না। তিনটার উত্তর পরিষ্কার না হলে আইডিয়াটা এখনো তৈরি নয়।
- ২বেশি মাল তোলার আগে চাহিদা যাচাই করুন। শুরুতে অল্প কয়েকটা পিস আনুন, অথবা নমুনার ছবি দেখিয়ে প্রি-অর্ডার নিন। পরিচিতজন আর ছোট একটা গ্রুপকে জিজ্ঞেস করুন, তারা কিনবেন কি না, কত দামে। “ভালো লেগেছে” আর “কিনব” এক কথা নয়; আসল উত্তর হলো অর্ডার।
- ৩সোর্সিং ঠিক করুন: পাইকারি বাজার, স্থানীয় কারিগর, নাকি নিজের তৈরি। মান নিজে হাতে দেখে নিন, আর অন্তত একজন বিকল্প সাপ্লায়ার রাখুন, যাতে একজন হঠাৎ মাল দেওয়া বন্ধ করলে আপনার দোকানও বন্ধ না হয়। নকল বা ভুয়া ব্র্যান্ডের পণ্য থেকে দূরে থাকুন। সরকারের ডিজিটাল কমার্স নির্দেশিকা নকল, ভেজাল আর মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রি নিষিদ্ধ করেছে।
- ৪পেজের নাম ঠিক করুন। নাম পরে বদলানো ঝামেলার, আর পুরনো ক্রেতারা নতুন নাম চিনতে পারেন না, তাই শুরুতেই ভেবে নিন। কীভাবে, তা নিচে আলাদা অংশে বলেছি।
- ৫ফেসবুক পেজটা ঠিকভাবে সাজান: সঠিক ক্যাটাগরি, পরিষ্কার প্রোফাইল ছবি আর কভার, যোগাযোগের নম্বর, আর একটা পিন করা পোস্ট যেখানে ডেলিভারি চার্জ, সময় আর রিটার্ন পলিসি লেখা। পেজ আর কনটেন্ট কীভাবে চালাবেন, তা বিস্তারিত আছে সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং কি লেখায়।
- ৬ডেলিভারি খরচ মাথায় রেখে দাম ঠিক করুন। পণ্যের কেনা দামের উপর কিছু যোগ করে দিলেই দাম হয় না; পুরো হিসাবটা নিচে আলাদা করে দেখিয়েছি।
- ৭প্রথম অর্ডারের আগেই পেমেন্ট আর ডেলিভারি ঠিক করুন: কোন কুরিয়ার, ঢাকার ভেতরে আর বাইরে চার্জ কত, অ্যাডভান্স নেবেন কি না। অর্ডার আসার পর এসব খুঁজতে গেলে প্রথম ক্রেতাই অপেক্ষা করতে করতে বিরক্ত হন।
- ৮অর্ডার, ডেলিভারির শর্ত আর রিটার্ন পলিসি বাংলায় লিখে পিন করুন: কত দিনে পৌঁছাবে, কোন ক্ষেত্রে পণ্য বদলে দেবেন, টাকা ফেরত কীভাবে দেবেন। এটা শুধু ভালো অভ্যাস নয়, সরকারি নির্দেশিকাতেও চাওয়া হয়েছে।
- ৯প্রথম দিন থেকে হিসাব রাখুন। একটা খাতা বা স্প্রেডশিটে প্রতিটা অর্ডার, খরচ, ফেরত আসা পার্সেল আর কে টাকা দিয়েছেন তা লিখুন। মাস শেষে এই হিসাবই বলে দেবে আসলে লাভ হচ্ছে কি না।
- ১০ওয়েবসাইট পরে, আগে নয়। অর্ডার নিয়মিত হলে, আর একই প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে দিন ফুরিয়ে গেলে, তখন একটা সাধারণ ওয়েবসাইট বা অর্ডার ফর্মের কথা ভাবুন।
পেজের নাম কীভাবে ঠিক করবেন
“অনলাইন বিজনেস পেজের নাম” লিখে খুঁজলে একশোটা নামের তালিকা পাওয়া যায়। সমস্যা হলো, সেই তালিকা হাজারজন দেখেছেন, আর অনেক নাম আগেই কেউ নিয়ে নিয়েছেন। তালিকার বদলে কয়েকটা নিয়ম মাথায় রাখুন:
- ছোট আর সহজ রাখুন। বাংলায় বলতে আর ইংরেজি হরফে লিখতে, দুভাবেই সহজ হতে হবে। কেউ বন্ধুকে মুখে নামটা বললে বন্ধু যেন একবারেই ফেসবুকে খুঁজে পান।
- পণ্য বা প্রতিশ্রুতির ইঙ্গিত দিন, যাতে নাম শুনে বোঝা যায় পেজটা কী নিয়ে। তবে পরে অন্য পণ্য যোগ করার ইচ্ছা থাকলে একটা মাত্র পণ্যে বেঁধে ফেলবেন না। নামে “শাড়ি” রেখে পরে থ্রি-পিস আর পাঞ্জাবি বিক্রি করলে নামটা বেমানান লাগে।
- পরিচিত কোনো ব্র্যান্ডের নাম নকল করবেন না, কাছাকাছি নামও রাখবেন না। এতে ট্রেডমার্কের ঝুঁকি তৈরি হয়, আর ক্রেতা ঠকেছেন মনে করলে বিশ্বাসও নষ্ট হয়।
- নামটা খালি আছে কি না দেখুন। ফেসবুক আর ইনস্টাগ্রামে একই নামে পেজ আছে কি না খুঁজুন, আর .com বা .com.bd ডোমেইন খালি আছে কি না দেখে নিন, যাতে পরে ওয়েবসাইট করলে একই নাম রাখা যায়।
- সংখ্যা আর অদ্ভুত বানান এড়িয়ে চলুন। শব্দের জায়গায় সংখ্যা বসানো বা ইচ্ছা করে বদলানো বানান মনে রেখে টাইপ করা কঠিন, আর ক্রেতা ভুল পেজে চলে যান।
নামের কয়েকটা ধরন কাজে আসে: মালিকের নাম বা জায়গার সাথে পণ্য (যেমন “রুমার হাতের কাজ”), একটা অর্থবহ বাংলা শব্দ, পণ্যের সাথে একটা প্রতিশ্রুতি (“তাজা” বা “খাঁটি” তখনই রাখবেন, যখন কথাটা সত্যি), কিংবা দুই শব্দের বাংলা-ইংরেজি মিশেল। উদাহরণটা শুধু ধরন বোঝাতে বানানো; নিজের নাম চূড়ান্ত করার আগে ফেসবুকে খুঁজে দেখুন। তারপর তিনটা নাম বাছাই করে মুখে বলে দেখুন, আর পাঁচজন সম্ভাব্য ক্রেতাকে শুনিয়ে পরদিন জিজ্ঞেস করুন কোন নামটা মনে আছে। যে নাম মনে থাকে, সেটাই কাজের নাম।
দাম ঠিক করা: ডেলিভারি খরচ মাথায় রেখে
নতুনরা প্রায়ই পণ্যের কেনা দামের সাথে একটা অংশ যোগ করে দাম ঠিক করেন, তারপর মাস শেষে দেখেন বিক্রি হয়েছে অনেক, কিন্তু টাকা কোথায় গেল বোঝা যাচ্ছে না। অনলাইনে একটা পণ্যের আসল খরচে আরও কয়েকটা জিনিস ঢোকে।
হিসাবটা এরকম: দাম = পণ্যের খরচ + প্যাকেজিং + ডেলিভারি খরচের যে অংশ আপনি বহন করবেন + ক্যাশ অন ডেলিভারি চার্জ + ফেরত আসা পার্সেলের ক্ষতি + প্রতি অর্ডারে বিজ্ঞাপনের খরচ + আপনার লাভ। শেষেরটা বাদে সবগুলোই খরচ, আর সবগুলো মেটানোর পরে যা থাকে, সেটাই লাভ।
ঢাকার ভেতরে আর বাইরে ডেলিভারি চার্জ আলাদা হয়। ঠিক করুন চার্জটা ক্রেতা আলাদা দেবেন, নাকি দামের ভেতরেই ধরা থাকবে। যেটাই করুন, পোস্টে আর ইনবক্সে পরিষ্কার করে লিখে দিন। পণ্য হাতে পাওয়ার সময় অপ্রত্যাশিত চার্জ দেখলে অনেক ক্রেতা পার্সেলই নেন না।
ফেরত আসা পার্সেল দুবার খরচ করায়: যাওয়ার ডেলিভারি চার্জ, আবার ফেরত আসার চার্জ, আর পণ্যটা নষ্ট হলে সেটাও। একটা উদাহরণ দিই। পাঠাও কুরিয়ার তাদের সাইটে জানিয়েছে, ঢাকার বাইরের পার্সেল ফেরত এলে ডেলিভারি চার্জ তো যায়ই, তার উপর সেই চার্জের ৫০% রিটার্ন চার্জ হিসেবে বাড়তি দিতে হয়; ঢাকা মেট্রোর ভেতরে পাঠানো পার্সেলে এই রিটার্ন চার্জ নেই। আর ক্যাশ অন ডেলিভারির জন্য তারা ঢাকা মেট্রোপলিটন সিটির ভেতরে ০.৫% আর ঢাকা সিটির বাইরে ১% চার্জ নেয়। কুরিয়ারভেদে আর সময়ের সাথে এসব হার বদলায়, তাই চুক্তির আগে কুরিয়ারের নিজের সাইটে বর্তমান হার দেখে নিন।
কিছু পার্সেল ফেরত আসবেই, এটা ধরে নিয়ে দামের মধ্যে একটা ছোট অংশ রাখুন; ফেরত আসবে না, এই আশায় বসে থাকবেন না। কতটা রাখবেন, তা প্রথম কয়েক মাসের নিজের হিসাব থেকেই বোঝা যাবে। লাভের কোনো নির্দিষ্ট হার এখানে বলছি না, কারণ পণ্যভেদে সেটা একেবারে আলাদা। শুধু যাচাই করুন, সব খরচ ধরে যে দাম আসে সেটা বাজারে টেকে কি না। না টিকলে সমস্যাটা সাধারণত দামে নয়, পণ্য বা উৎসে।
পেমেন্ট, ক্যাশ অন ডেলিভারি আর কুরিয়ার
নতুন একটা পেজে অ্যাডভান্স টাকা পাঠাতে বেশিরভাগ ক্রেতা ভরসা পান না, সেটাই স্বাভাবিক। তাই শুরুতে ক্যাশ অন ডেলিভারিই প্রধান পথ। কুরিয়ার পণ্য পৌঁছে দিয়ে ক্রেতার কাছ থেকে টাকা নেয়, তারপর নিজের চার্জ কেটে বাকি টাকা আপনাকে পাঠায়।
ছোট অনলাইন বিক্রেতাদের সাথে কাজ করে এমন কুরিয়ার সার্ভিস আছে, যেমন পাঠাও কুরিয়ার, স্টেডফাস্ট বা রেডএক্স। নামগুলো শুধু উদাহরণ, কোনো সুপারিশ নয়। কোন কোন এলাকায় ডেলিভারি দেয়, চার্জ কত, আর বিক্রির টাকা কত দিনে আপনার হাতে আসে, এই তিনটা মিলিয়ে বাছাই করুন। চাইলে শুরুতে দুটো কুরিয়ার দিয়ে কয়েকটা করে পার্সেল পাঠিয়ে তুলনা করতে পারেন।
অনলাইনে টাকা নিতে বিকাশ আর নগদ দুটোই ব্যবসার জন্য মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট দেয়। নগদের মার্চেন্ট অ্যাকাউন্টে মার্চেন্ট কিউআর আর কাউন্টার পেমেন্টে টাকা নেওয়া যায়, আর লেনদেনের হিসাব দেখা যায়। বিকাশের মার্চেন্ট আবেদনে ব্যবসার তথ্যের সাথে ফেসবুক পেজ, ওয়েবসাইট বা অ্যাপের লিংক চাওয়া হয়, আর যাদের ট্রেড লাইসেন্স নেই, তাদের জন্য তারা পার্সোনাল রিটেইল অ্যাকাউন্ট খোলার কথা বলে। কী কী কাগজ লাগবে তা সময়ের সাথে বদলায়, তাই আবেদনের আগে বিকাশ আর নগদের ওয়েবসাইটের বিজনেস অংশে বর্তমান শর্ত দেখে নিন।
দূরের জেলায় পাঠানো বা অর্ডার অনুযায়ী বানানো পণ্যে অনেকে কিছু টাকা অ্যাডভান্স নেন। নিলে পরিমাণটা সামান্য রাখুন আর অর্ডার নেওয়ার সময়েই পরিষ্কার করে বলুন। মনে রাখবেন, সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী অ্যাডভান্স নিয়ে যে অর্ডার সময়মতো ডেলিভারি দিতে পারলেন না, তার পুরো টাকা ১০ দিনের মধ্যে ফেরত দিতে হয়, যে মাধ্যমে টাকা এসেছিল সেই মাধ্যমেই।
দুটো নিরাপত্তার কথা। কাউকে ওটিপি বা পিন বলবেন না, কেউ নিজেকে বিকাশ বা নগদের লোক বলে পরিচয় দিলেও না। আর ব্যবসার লেনদেনের জন্য আলাদা নম্বর রাখুন, যাতে ব্যক্তিগত আর ব্যবসার টাকা মিশে না যায়।
ক্রেতার মেসেজ, ডেলিভারির সময় আর রিটার্ন
এফ-কমার্সে দোকানের কাউন্টার হলো ইনবক্স। বিক্রি হবে কি না, তার অনেকটাই ঠিক হয় সেখানে। কয়েকটা অভ্যাস শুরু থেকেই গড়ে তুলুন:
- দ্রুত আর ভদ্রভাবে উত্তর দিন। দাম, ডেলিভারি চার্জ, সাইজ আর কত দিনে পৌঁছাবে, এই প্রশ্নগুলো বারবার আসবে। এগুলোর জন্য সেভ করা উত্তর তৈরি রাখুন, তবে পাঠানোর আগে প্রশ্নের সাথে মিলিয়ে নিন।
- কুরিয়ারে দেওয়ার আগে প্রতিটা অর্ডার ফোনে বা মেসেজে কনফার্ম করুন: নাম, ঠিকানা, পণ্য, সাইজ আর মোট টাকা। এতে ভুয়া অর্ডার আর ফেরত আসা পার্সেল দুটোই কমে।
- আসল ছবি আর সঠিক মাপ দিন। অন্যের ছবি বা বেশি এডিট করা ছবি দেখালে পণ্য হাতে পেয়ে ক্রেতা ফেরত দেবেন, পরের বার আর কিনবেন না।
- ডেলিভারির সময় মেনে চলুন। সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী পুরো দাম পরিশোধের পর ক্রেতা আর বিক্রেতা একই শহরে থাকলে ৫ দিনের মধ্যে, আর অন্য শহর বা গ্রামে থাকলে ১০ দিনের মধ্যে পণ্য পৌঁছে দিতে হয়।
- কেনাকাটা, টাকা ফেরত, পণ্য ফেরত বা বদল, ডেলিভারির পদ্ধতি আর সময়, এসবের শর্ত বাংলায় লিখে পেজে পরিষ্কারভাবে দেখান। ফেসবুক পেজের জন্যও নির্দেশিকা এটাই চেয়েছে।
- অভিযোগ এলে ফেলে রাখবেন না। নির্দেশিকা অনুযায়ী অভিযোগের সমাধান করে ক্রেতাকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে জানাতে হয়।
- সত্যিকারের রিভিউ মুছবেন না, খারাপ হলেও। নির্দেশিকা রিভিউ মুছে ফেলা নিষিদ্ধ করেছে, আর বিক্রেতা বা তার কর্মীরা নিজেরা রিভিউ লিখতে পারবেন না। খারাপ রিভিউয়ের নিচে ভদ্রভাবে সমাধানের কথা লিখলে সেটাই নতুন ক্রেতার কাছে ভরসার প্রমাণ হয়।
নিবন্ধন আর নিয়মকানুন
অনলাইন বিজনেসের কোনো নিয়ম নেই, এমন কথা অনেকে বলেন। কথাটা ঠিক নয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ২০২১ সালের ৪ জুলাই বাংলাদেশ গেজেটে “ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা ২০২১” প্রকাশ করেছে, যা সারা দেশে প্রযোজ্য আর প্রকাশের সাথে সাথেই কার্যকর হয়েছে। ফেসবুক পেজে বিক্রিও এর আওতায় পড়ে। উপরে ডেলিভারির সময়, রিটার্ন পলিসি, অভিযোগ আর রিভিউ নিয়ে যা বলেছি, তা এই নির্দেশিকা থেকেই।
নিবন্ধনের বিষয়ে নির্দেশিকার ৩.১.১২ অনুচ্ছেদ বলছে, ডিজিটাল কমার্স পরিচালনাকারী সবাইকে অন্তত একটি নিবন্ধন নিতে হবে: ট্রেড লাইসেন্স, ভ্যাট নিবন্ধন, টিআইএন (TIN), ইউবিআইডি (UBID) অথবা পিআরএ (PRA, পার্সোনাল রিটেইল অ্যাকাউন্ট, যার কথা উপরে বিকাশের প্রসঙ্গে বলেছি)। আর সেই নম্বর মার্কেটপ্লেস বা সোশ্যাল মিডিয়া পেজে দেখাতে হবে। নির্দেশিকা অনুযায়ী ইউবিআইডি হলো বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীয় ডিজিটাল কমার্স সেলের দেওয়া নিবন্ধন নম্বর, আর পিআরএ হলো বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া খুচরা বিক্রেতার নিবন্ধন নম্বর। একই নির্দেশিকার ৩.১.১৩ অনুচ্ছেদ বলছে, পর্যায়ক্রমে সব ডিজিটাল কমার্স প্রতিষ্ঠানের জন্য ইউবিআইডি বাধ্যতামূলক করা হবে। তাই অন্য কোনো নিবন্ধন দিয়ে শুরু করলেও ইউবিআইডির কথা এখনই মাথায় রাখা ভালো।
ইউবিআইডি এখন ডিজিটাল বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন বা ডিবিআইডি (DBID) নামে দেওয়া হয়, সরকারি পোর্টাল dbid.gov.bd থেকে। এর কাগজপত্র, ফি বা শর্ত এখানে লিখছি না, কারণ এগুলো বদলায়। আবেদনের আগে dbid.gov.bd আর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাইট mincom.gov.bd-তে বর্তমান নিয়ম দেখে নিন।
ট্রেড লাইসেন্স দেয় আপনার এলাকার সিটি করপোরেশন, পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদ। কী কাগজ লাগবে আর খরচ কত, তা নিজের এলাকার অফিস থেকে জেনে নিন। মনে রাখবেন, নির্দেশিকার শর্ত হলো তালিকার অন্তত একটি নিবন্ধন; ট্রেড লাইসেন্স একমাত্র পথ নয়, তবে কোনো নিবন্ধন ছাড়া চালানো নির্দেশিকার সাথে মেলে না।
নির্দেশিকায় আরও দুটো কথা নতুনদের জানা দরকার। ই-কমার্সের মাধ্যমে মাল্টি-লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) বা নেটওয়ার্ক ব্যবসা চালানো যাবে না। আর অনলাইনে ওষুধ বিক্রি করতে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের লাইসেন্স লাগে।
শেষে একটা সতর্কতা: এটা আইনি পরামর্শ নয়। নির্দেশিকার পুরো লেখা মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের সাইটে (dpp.gov.bd) গেজেট আকারে আছে। বড় কোনো সিদ্ধান্তের আগে মূল লেখাটা পড়ুন, দরকার হলে অভিজ্ঞ কারও সাথে কথা বলুন।
বাংলাদেশের জন্য ১৫টি বাস্তব অনলাইন বিজনেস আইডিয়া
প্রতিটা আইডিয়ার সাথে দুটো কথা লিখেছি: কী লাগে, আর কোথায় কঠিন। কোনোটার সাথে আয়ের অঙ্ক দিইনি। সেটা নির্ভর করে আপনার উৎস, দাম আর পরিশ্রমের উপর, আর যিনি আগে থেকে অঙ্ক বলে দেন, তিনি অনুমান করছেন।
- ১ঘরে রান্না করা খাবার আর ফ্রোজেন স্ন্যাকস: লাগে পরিচ্ছন্ন রান্নাঘর আর কাছাকাছি দ্রুত ডেলিভারি। কঠিন দিক: খাবার দ্রুত নষ্ট হয়, তাই ডেলিভারি এলাকা ছোট রাখতে হয়। খাবার বিক্রির নিজস্ব নিয়মকানুনও আছে, যা শুরুর আগে জেনে নিতে হবে।
- ২ঘরে বানানো কেক আর ডেজার্ট: লাগে প্রতিবার একই মান আর ভালো ছবি। কঠিন দিক: ভঙ্গুর পণ্য, পথে নষ্ট হওয়ার ভয়, আর ঈদ বা বিশেষ দিনে একসাথে অনেক অর্ডার সামলানো। সিলেটের একজন হোম বেকার শুরুতে নিজের এলাকার ভেতরে নিজেই ডেলিভারি দিলে এই ঝুঁকি অনেকটা কমে।
- ৩পোশাক (শাড়ি, থ্রি-পিস, পাঞ্জাবি), পাইকারি বাজার থেকে এনে: লাগে ভরসার সাপ্লায়ার আর আসল রঙের ছবি। কঠিন দিক: প্রতিযোগিতা অনেক, আর সাইজ বা রং না মেলায় পার্সেল ফেরত আসে। ঢাকার একটা ছোট কাপড়ের দোকান অনলাইনে এলে তার সুবিধা হলো, দোকানের পুরনো ক্রেতারাই প্রথম অনলাইন ক্রেতা হতে পারেন।
- ৪হস্তশিল্প (নকশিকাঁথা, পাটের জিনিস, মাটির জিনিস): লাগে এমন কারিগর যাদের উপর ভরসা করা যায়। কঠিন দিক: বানাতে সময় লাগে, আর হাতের কাজের এমন দাম ঠিক করা কঠিন যাতে কারিগরও ঠকেন না, ক্রেতাও মুখ ফিরিয়ে নেন না।
- ৫হাতে বানানো গয়না: লাগে ডিজাইনের চোখ আর অল্প স্টক। কঠিন দিক: ভালো ডিজাইন অন্যরা দ্রুত নকল করে, আর অর্ডারের দাম কম হলে তুলনায় ডেলিভারি চার্জ বেশি মনে হয়।
- ৬অর্গানিক বা বিশেষ খাদ্যপণ্য (মধু, ঘি, মৌসুমি আম, খেজুর): লাগে এমন উৎস যা আপনি নিজে যাচাই করতে পারেন। কঠিন দিক: “খাঁটি” দাবি সত্যি হতে হবে, মৌসুম শেষে বিক্রি কমে যায়, আর ক্রেতার বিশ্বাস অর্জনে সময় লাগে।
- ৭মসলা আর আচার: লাগে এমন প্যাকেজিং যা পথে লিক করে না। কঠিন দিক: লেবেল, মেয়াদ আর খাবারের নিয়ম মানা, আর পণ্যটা কত দিন ভালো থাকে তা নিশ্চিত জানা।
- ৮শিশুদের জিনিস আর খেলনা: লাগে নিরাপদ পণ্য আর তার উৎস সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা। কঠিন দিক: বাবা-মা নিরাপত্তা নিয়ে খুব সতর্ক থাকেন, আর বাজারে নকলও আছে।
- ৯গাছ আর বাগানের জিনিস: লাগে গাছের যত্ন সম্পর্কে জ্ঞান। কঠিন দিক: পথে গাছ মরে যেতে পারে, তাই সাধারণত নিজের শহরের ভেতরেই ডেলিভারি দেওয়া যায়।
- ১০গ্যাজেট অ্যাকসেসরিজ (চার্জার, কেস, হেডফোন): লাগে ভরসার আমদানিকারক বা পাইকার। কঠিন দিক: বাজারে নকল অনেক, ওয়ারেন্টি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, আর প্রতি পিসে লাভ খুব কম।
- ১১বই, নতুন বা পুরনো: লাগে একটা গোছানো তালিকা আর বই আনার উৎস। কঠিন দিক: বড় অনলাইন বইয়ের দোকানের সাথে প্রতিযোগিতা, আর লাভ কম। পুরনো বা দুষ্প্রাপ্য বই, কিংবা একটা নির্দিষ্ট বিষয়ের বইয়ে মন দিলে নিজের জায়গা তৈরি করা সহজ হয়।
- ১২কাস্টম প্রিন্ট (মগ, টি-শার্ট, উপহারের জিনিস): লাগে একজন প্রিন্ট পার্টনার আর ডিজাইনের দক্ষতা। কঠিন দিক: অর্ডার অনুযায়ী বানানো জিনিসে ভুল হলে সেটা আর অন্য কাউকে বিক্রি করা যায় না, আর অ্যাডভান্স নিতে গেলে ক্রেতার ভরসা লাগে।
- ১৩বিউটি আর স্কিনকেয়ার: লাগে আসল পণ্য, যার উৎস পরিষ্কার। কঠিন দিক: নকল চেনা সহজ নয়, আর নির্দেশিকা নকল বা ভেজাল পণ্য বিক্রি নিষিদ্ধ করেছে; একবার নকল বিক্রি হলে পেজের সুনাম ফেরানো কঠিন। কিছু পণ্যের জন্য আলাদা অনুমোদনও লাগতে পারে, তাই আগে খোঁজ নিন।
- ১৪ঘর সাজানোর জিনিস আর ছোট আসবাব: লাগে একজন কাঠমিস্ত্রি বা কারিগর। কঠিন দিক: বড় জিনিসের ডেলিভারি খরচ বেশি, আর পথে ভাঙার ঝুঁকি থাকে।
- ১৫অনলাইনে সেবা বিক্রি (টিউশন, ডিজাইন, ছবি তোলা, দর্জির অল্টারেশন): লাগে একটা দক্ষতা আর আগের কাজের নমুনা। কঠিন দিক: কাজ আপনার সময়ে বাঁধা, আপনি কাজ না করলে বিক্রিও নেই। একজন শিক্ষার্থী পড়াশোনার পাশাপাশি এভাবে শুরু করতে পারেন, কারণ মাল কিনে রাখতে হয় না।
কোনটা বাছবেন? যেটায় আপনার কোনো সুবিধা আছে: একটা ভালো উৎস, একটা দক্ষতা, কিংবা আগে থেকে চেনা কিছু ক্রেতা। যে আইডিয়া নিয়ে ইউটিউবে সবচেয়ে বেশি ভিডিও, সেটা নয়, কারণ সেখানে প্রতিযোগীও সবচেয়ে বেশি।
অনলাইন বিজনেসের মার্কেটিং
পেজ খোলার পর প্রথম প্রশ্ন আসে, মানুষ দেখবে কীভাবে। শুরুটা হোক বিনা খরচের কাজ দিয়ে: নিয়মিত পোস্ট, পণ্য ব্যবহারের ছবি আর ছোট ভিডিও, কীভাবে বানানো বা বাছাই করা হয় তার পেছনের গল্প, আর সন্তুষ্ট ক্রেতার রিভিউ। চট্টগ্রামের একটা রেস্টুরেন্ট যদি প্রতিদিনের বিশেষ খাবারের ছবি আর রান্নাঘরের ছোট ভিডিও দেয়, সেটা সাজানো বিজ্ঞাপনের চেয়ে অনেক সময় বেশি বিশ্বাসযোগ্য লাগে।
আরেকটা সহজ কাজ: প্রতিটা অর্ডারের সময় জিজ্ঞেস করুন, ক্রেতা পেজটার কথা জানলেন কোথা থেকে। বন্ধুর কাছ থেকে, কোনো গ্রুপের পোস্ট থেকে, নাকি বিজ্ঞাপন দেখে। কয়েক সপ্তাহ পর এই উত্তরগুলোই বলে দেবে কোন কাজে সময় আর টাকা দেওয়া উচিত। আর খুশি ক্রেতাকে বন্ধুদের জানাতে অনুরোধ করুন, তাদের অনুমতি নিয়ে তাদের কথা রিভিউ হিসেবে পেজে রাখুন।
পেজে কিছু কনটেন্ট আর কয়েকটা রিভিউ জমলে ছোট বাজেটে একটা পোস্ট বুস্ট করে দেখুন, কত টাকায় কতগুলো মেসেজ আর অর্ডার এলো। হিসাব মিললে তখন নিয়মিত বিজ্ঞাপনের কথা ভাবুন। পেজ, কনটেন্ট আর বিজ্ঞাপন কীভাবে চালাবেন, তা নিয়ে বিস্তারিত আছে সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং কি লেখায়। আর ফেসবুকের বাইরে গুগল, ইমেইলসহ অন্য চ্যানেলগুলোর বড় ছবিটা পাবেন ডিজিটাল মার্কেটিং কি লেখায়।
নতুনদের সাধারণ ভুল
- চাহিদা যাচাই না করেই একগাদা মাল তুলে ফেলা।
- ডেলিভারি চার্জ, ক্যাশ অন ডেলিভারি চার্জ আর ফেরত আসা পার্সেলের খরচ বাদ দিয়ে দাম ঠিক করা।
- ডেলিভারির শর্ত আর রিটার্ন পলিসি লিখে না রাখা, আর কুরিয়ারে দেওয়ার আগে অর্ডার কনফার্ম না করা।
- অন্য পেজের ছবি কপি করা, কিংবা নকল পণ্য আসল বলে বিক্রি করা।
- পুরো ব্যবসা একটা ফেসবুক পেজের উপর দাঁড় করানো। পেজ রেস্ট্রিক্টেড হয়ে গেলে দোকানও বন্ধ, তাই নিয়মিত ক্রেতাদের একটা তালিকা নিজের কাছে রাখুন।
- পেজে কনটেন্ট আর রিভিউ জমার আগেই পোস্ট বুস্ট করা।
- ব্যক্তিগত আর ব্যবসার টাকা এক পকেটে রাখা, ফলে লাভ হচ্ছে না লোকসান, সেটাই আর বোঝা যায় না।
নিজের ব্যবসার মার্কেটিং নিজে শিখুন
পণ্য, দাম আর ডেলিভারি ঠিক হলে ব্যবসার বাকি অর্ধেক হলো মার্কেটিং: কাকে বিক্রি করবেন, কী বলবেন, কোথায় বলবেন। শুরুতে এটা শিখতে বড় বাজেট লাগে না।
আমার বাংলা কোর্স ডিজিটাল মার্কেটিং ফান্ডামেন্টালস-এ ২৫টি লেসন আছে, তার ২৪টিই ফ্রিতে দেখা যায়। এতে সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং, ফেসবুক মার্কেটিং, লোকাল মার্কেটিং উইথ গুগল বিজনেস আর কনভারসেশনাল মার্কেটিং নিয়ে আলাদা লেসন আছে, যা একটা এফ-কমার্স পেজের জন্য সরাসরি কাজে লাগে। কোর্সটি কিনলে বাকি একটি লেসন, ফাইনাল অ্যাসেসমেন্ট কুইজ আর সার্টিফিকেট খুলে যায়, আর অ্যাক্সেস থাকে আজীবন।
যারা বই পড়ে শিখতে পছন্দ করেন, তাদের জন্য আছে গোড়া থেকে ডিজিটাল মার্কেটিং বইটি।
সাধারণ প্রশ্ন
- এফ-কমার্স আর ই-কমার্সের মধ্যে পার্থক্য কী?
- ই-কমার্স হলো অনলাইনে কেনাবেচার বড় পরিসর: নিজের ওয়েবসাইট বা মার্কেটপ্লেস, যেখানে কার্ট আর চেকআউট থাকে। এফ-কমার্স তার একটা অংশ, যেখানে বিক্রি হয় ফেসবুক পেজ, গ্রুপ বা মেসেঞ্জারে, অর্ডার আসে মেসেজে আর টাকা সাধারণত ক্যাশ অন ডেলিভারিতে। শুরু করা সস্তা, তবে প্ল্যাটফর্মের নিয়ন্ত্রণ ফেসবুকের হাতে।
- অনলাইন বিজনেস করতে কি ট্রেড লাইসেন্স লাগে?
- ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা ২০২১ অনুযায়ী অনলাইনে বিক্রি করলে অন্তত একটি নিবন্ধন লাগবে: ট্রেড লাইসেন্স, ভ্যাট নিবন্ধন, টিআইএন, ইউবিআইডি (এখন ডিবিআইডি) অথবা পিআরএ, আর সেই নম্বর পেজে দেখাতে হবে। তাই ট্রেড লাইসেন্স একমাত্র পথ নয়, তবে কোনো নিবন্ধন ছাড়া চালানো নির্দেশিকার সাথে মেলে না। আবেদনের আগে dbid.gov.bd আর নিজের এলাকার অফিসে বর্তমান নিয়ম দেখে নিন।
- অল্প পুঁজিতে কোন অনলাইন বিজনেস শুরু করা যায়?
- যেসব ব্যবসায় আগে থেকে বেশি মাল কিনে রাখতে হয় না, সেগুলো দিয়ে শুরু করা সহজ: অর্ডার পেয়ে বানানো কেক বা খাবার, প্রি-অর্ডারে পোশাক, কাস্টম প্রিন্ট, কিংবা টিউশন বা ডিজাইনের মতো সেবা। টাকার অঙ্কের চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো আপনার কোন সুবিধা আছে: একটা উৎস, একটা দক্ষতা বা চেনা ক্রেতা। অল্প করে চাহিদা যাচাই করে তারপর বাড়ান।
- অনলাইন বিজনেস পেজের নাম কীভাবে ঠিক করব?
- নামটা ছোট রাখুন, যাতে বাংলায় বলা আর ইংরেজি হরফে লেখা দুটোই সহজ হয়। নাম শুনে যেন পণ্যের ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তবে একটা পণ্যে বেঁধে ফেলবেন না। পরিচিত কোনো ব্র্যান্ডের মতো নাম রাখবেন না, আর ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও ডোমেইনে নামটা খালি আছে কি না দেখে নিন। শেষে তিনটা নাম পাঁচজন সম্ভাব্য ক্রেতাকে শুনিয়ে দেখুন কোনটা মনে থাকে।
- ক্যাশ অন ডেলিভারিতে রিটার্ন কমানোর উপায় কী?
- কুরিয়ারে দেওয়ার আগে প্রতিটা অর্ডার ফোনে কনফার্ম করুন, আসল ছবি আর সঠিক মাপ দিন, আর ডেলিভারি চার্জ, সময় ও রিটার্ন পলিসি আগেই পরিষ্কার করে লিখে রাখুন। দূরের জেলা বা অর্ডার অনুযায়ী বানানো পণ্যে সামান্য অ্যাডভান্স নিতে পারেন, তবে সেটা অর্ডার নেওয়ার সময়েই জানিয়ে দেবেন। আর যত দ্রুত পাঠাবেন, ক্রেতার মত বদলানোর সুযোগ তত কম।
- F commerce meaning ki?
- এফ-কমার্স মানে ফেসবুক কমার্স, অর্থাৎ ফেসবুক পেজ, গ্রুপ বা মেসেঞ্জারের মাধ্যমে পণ্য বা সেবা বিক্রি। শব্দটা বাংলাদেশে বেশি চলে; অন্য দেশে একই জিনিসকে সাধারণত সোশ্যাল কমার্স বলা হয়। এখানে অর্ডার আসে মেসেজে, আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে টাকা আসে ক্যাশ অন ডেলিভারিতে।